শহরের সৌন্দর্য বাড়াতে কিংবা বিভিন্ন এলাকার পরিচয় তুলে ধরতে রাজধানী ঢাকাজুড়ে স্থাপন করা ভাস্কর্যগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না বললেই চলে। কোনোটির রং উঠে গেছে, কোনোটি ভেঙে গিয়ে ভেতরের লোহার কাঠামো বেরিয়ে এসেছে, আবার কোনোটি দাঁড়িয়ে আছে আবর্জনা ও ময়লার মধ্যে।
এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ বনানীর ৩৫ নম্বর সড়কে রয়েছে। বনানী ১১ নম্বর ব্রিজের ঠিক আগে লেকের পাশে থাকা ভাস্কর্যগুলো। যেখানে রয়েছে একটি বাঘ, তিনটি হরিণ, একটি ঘোড়া ও দুটি জেব্রা। প্রাণীগুলোর শরীর থেকে রং উঠে গিয়ে কোথাও কোথাও সাদা প্লাস্টার বেরিয়ে পড়েছে। একটি ভাস্কর্যের পা ভেঙে গিয়ে সেখান থেকে মরিচাধরা লোহার রড বেরিয়ে আছে, যা একটি জীর্ণ কংক্রিটের ব্লকের ওপর ঠেকানো। বানানী সোসাইটি জানিয়েছে, সড়কটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ডিএনসিসির পরিবেশ, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবুল কাশেম বিষয়টি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছে পাঠান। রাজউকও এর দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানায়।
এদিকে, এলিফ্যান্ট রোডের সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে রয়েছে একটি হাতির ভাস্কর্য। সড়কটির নামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কয়েক বছর আগে এটি স্থাপন করা হয়েছিল। এতে রয়েছে একটি মা হাতি ও তার শাবক, দুটিরই শুঁড় আকাশের দিকে তোলা। বড় হাতিটির দুটি দাঁতই ভেঙে গেছে; ক্ষতিগ্রস্ত অংশের ভেতর দিয়ে কালো তার দেখা যাচ্ছে। ছোট হাতিটির দাঁতের গোড়ায় একটি মরিচাধরা স্ক্রু আটকে আছে এবং তার শুঁড়জুড়ে লালচে দাগ দেখা যাচ্ছে।

পাথরের বেদির ফাঁক দিয়ে ঘাস গজিয়ে উঠেছে। পুরোনো সবুজ-সাদা রঙের প্রলেপ নষ্ট হয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধুলো, বৃষ্টি, রোদ ও দূষণের প্রভাবে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভাস্কর্যটির রং উঠে গেছে। এটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অঞ্চল-১-এর ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন।
ডিএসসিসির পরিবেশ, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের সৌন্দর্যবর্ধন কর্মসূচির আওতায় এসব ভাস্কর্যের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশনকে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব দেয়।’

তিনি বলেন, ২০২০ সালের পর দীর্ঘ সময় ধরে এই ব্যবস্থা স্থগিত ছিল। নির্বাচনের পর বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাওয়ায় এখন এটি আবার পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
অবহেলার চিত্র দেখা যায় ফার্মগেটেও। আনন্দ সিনেমা হলের পাশে থাকা ‘ফিশ স্কাল্পচার’ বা মাছের ভাস্কর্যটি এখন প্রায় গাছপালার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। শিল্পী হামিদুজ্জামান খান ২০০৫ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের জন্য এটি তৈরি করেন। ইস্পাতের তৈরি এই ভাস্কর্যে তিনটি মাছ দেখানো হয়েছে, যা বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদ ও জলজ জীবনের প্রতীক।

ভাস্কর্যটির ফোয়ারার জলাধার এখন কালচে, স্থির পানিতে ভরা। সেখানে জমেছে শুকনো পাতা, প্লাস্টিকের ব্যাগ ও অন্যান্য আবর্জনা। ইস্পাতের গায়েও ময়লা জমে আছে। এটি ডিএনসিসির তেজগাঁও অঞ্চল বা অঞ্চল-৫-এর আওতাধীন।
এই মুহূর্তে ভাঙা পা-ওয়ালা বাঘ, ভাঙা দাঁতের হাতি এবং আবর্জনার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া মাছ–সবই স্বস্থানে এখনো দাঁড়িয়ে আছে। কেবল তারা এমন এক শহরের নীরব সঙ্গী, যে শহর যেন তাদের অস্তিত্বই ভুলে গেছে।


