আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, স্পেন ও ইংল্যান্ড—এই চার দল সেমিফাইনালে পা রাখায় বিশ্বকাপের ফাইনাল নিয়ে তৈরি হয়েছে চারটি আকর্ষণীয় সম্ভাবনা। প্রতিটি সম্ভাব্য ফাইনালের পেছনেই লুকিয়ে রয়েছে রোমাঞ্চকর ও বৈচিত্র্যময় গল্প। আর সেই গল্প ফিফা তুলে ধরেছে তাদের ওয়েবসাইটে।
শেষ পর্যন্ত ফাইনালে যাওয়ার লড়াইটা রূপ নিয়েছে ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনার মধ্যে। কোয়ার্টার ফাইনালের রোমাঞ্চকর অধ্যায় শেষ হওয়ার পর এখন এটি নিশ্চিত, ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসরে আমরা কোনো নতুন চ্যাম্পিয়ন পাচ্ছি না।
এবার ট্রফি ঘরে তুলতে পারে ইংল্যান্ড বা স্পেন, যারা প্রত্যেকেই তাদের জার্সিতে দ্বিতীয় তারকা যোগ করার অপেক্ষায় রয়েছে; অথবা ফ্রান্স, যাদের লক্ষ্য তৃতীয়বারের মতো বিশ্বসেরা হওয়া; কিংবা আর্জেন্টিনা, যারা ১৯৬২ সালের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে তাদের চতুর্থ শিরোপা নিজেদের করে নিতে মরিয়া।
আগামী ১৯ জুলাই (বাংলাদেশ সময় ২০ জুন মধ্যরাত একটা) নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে ফাইনালের চারটি সম্ভাব্য সমীকরণ রয়েছে—ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে ইংলিশ চ্যানেলের এপার-ওপারের হাইভোল্টেজ লড়াই, কাতার ২০২২ বিশ্বকাপের সেই অবিশ্বাস্য ফাইনালের পুনরাবৃত্তি, ইউরো ২০২৪ ফাইনালের একটি রোমাঞ্চকর পুনঃমঞ্চায়ন, অথবা বর্তমান বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ও বর্তমান ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নদের মধ্যকার এক জমজমাট যুদ্ধ।
ফ্রান্স বনাম ইংল্যান্ড
যদি কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং তার দল ফ্রান্স সেমিফাইনালে স্পেনকে পরাস্ত করতে পারে এবং টমাস টুখেলের ইংলিশ শিষ্যরা আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে, তবে নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়াম ইউরোপের এই দুই ফুটবল পরাশক্তির মধ্যকার প্রথম কোনো বিশ্বকাপ ফাইনালের সাক্ষী হবে। ‘থ্রি লায়ন্স’ বা ইংল্যান্ড এর আগে মাত্র একবারই বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে পেরেছিল, ১৯৬৬ সালে নিজেদের মাটিতে পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে। সেবার অতিরিক্ত সময়ে ৪-২ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল তারা। অন্যদিকে, ফ্রান্স যদি ফাইনালে ওঠে, তবে ২০১৮ ও ২০২২ সালের পর এটি হবে তাদের টানা তৃতীয় ফাইনাল খেলার গৌরব।
এই ম্যাচটি হলে তা বিশ্বের অন্যতম বড় দুটি ক্লাবের সতীর্থদের এক অবিস্মরণীয় সন্ধ্যায় একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে। রিয়াল মাদ্রিদের দুই মহাতারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং জুড বেলিংহাম সেই চকচকে ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবেন। আবার অন্যদিকে বায়ার্ন মিউনিখের হ্যারি কেইন এবং মাইকেল অলিসেও থাকবেন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে।
এছাড়া, কাতার ২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল ইংল্যান্ডকে। সেই হারের মধুর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ইংল্যান্ড এই ম্যাচটিকে একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখবে।

ফ্রান্স বনাম আর্জেন্টিনা
এই ম্যাচটি হবে কাতার ২০২২ বিশ্বকাপের সেই রোমাঞ্চকর ফাইনালের পুনরাবৃত্তি, যা দেখার জন্য ফুটবলপ্রেমীরা দীর্ঘকাল ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। লুসাইল স্টেডিয়ামে ৩-৩ গোলে ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে হারিয়ে আলবিসেলেস্তেরা বিশ্বজয় করেছিল। সাড়ে তিন বছর পর ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্রফিটি জেতার জন্য এই দুই দল আবারও এক মহাযুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে। এমন তিক্ত পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে মুখিয়ে থাকবে ফরাসিরা, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার লক্ষ্য হবে তাদের জার্সিতে চতুর্থ তারকা যুক্ত করা। একই সাথে আর্জেন্টিনার সামনে ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুবার বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য রেকর্ড গড়ার হাতছানি।
ফলাফল যা-ই হোক না কেন, আটটি করে গোল নিয়ে গত বিশ্বকাপের যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতা এমবাপ্পে এবং লিওনেল মেসির মধ্যকার এই লড়াই হবে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর। পেছনের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এটি কেবল ২০২২ সালের ফাইনালের পুনরাবৃত্তিই নয়, বরং ‘বেস্ট অফ থ্রি’ সিরিজের চূড়ান্ত ফয়সালাও বটে। কাতারের সেই মহাকাব্যিক ফাইনালের চার বছর আগে, রাশিয়া ২০১৮ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে এক তরুণ এমবাপ্পের জাদুতে আর্জেন্টিনাকে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়েছিল ফ্রান্স এবং পরবর্তীতে তারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

স্পেন বনাম ইংল্যান্ড
স্পেন যদি ফ্রান্সের বাধা টপকাতে পারে এবং ইংল্যান্ড যদি আর্জেন্টিনাকে বিদায় করে দেয়, তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালটি হবে উয়েফা ইউরো ২০২৪-এর ফাইনালের একটি পুনঃমঞ্চায়ন। ইউরো ২০২৪-এর ফাইনালে লা রোজাদের (স্পেন) কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরেছিল থ্রি লায়ন্সরা(ইংল্যান্ড)। ঠিক দুই বছর পর হ্যারি কেইন এবং তার দলের সামনে সুযোগ আসবে সেই হারের প্রতিশোধ নেওয়ার। ইংল্যান্ড ও স্পেন এর আগে মাত্র একবারই বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে পেরেছিল—যথাক্রমে ১৯৬৬ ও ২০১০ সালে, এবং দুবারই তারা শিরোপা জয় করেছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দুই দলের মুখোমুখি হওয়াটা এমনিতেই বেশ বিরল এক ঘটনা। ইউরোপীয় টুর্নামেন্টগুলোতে এই দুই পরাশক্তি একাধিকবার মুখোমুখি হলেও, বিশ্বকাপের ইতিহাসে তারা কেবল দুইবার একে অপরের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে। প্রথমবার ১৯৫০ সালে ব্রাজিলের মাটিতে গ্রুপ পর্বে লা রোজারা ১-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে। এর তিন দশকেরও বেশি সময় পর, ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে তাদের মধ্যকার ম্যাচটি গোলশূন্য ড্রয়ে শেষ হয়, যার ফলে দ্বিতীয় গ্রুপ পর্ব থেকেই দুই দলই বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছিল।
ঠিক চুয়াল্লিশ বছর পর, বিশ্বকাপের ফাইনালে এই দুই দলের দেখা হওয়ার এক দুর্দান্ত সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা
স্পেন এবং আর্জেন্টিনা যদি নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের টিকিট কাটার চূড়ান্ত বাধাটি পার হতে পারে, তবে আমরা সম্পূর্ণ স্প্যানিশভাষী দুটি দেশের ফাইনাল দেখতে পাব। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন ঘটনা বেশ বিরল হলেও নজিরবিহীন নয়।
যদি সত্যিই লা রোজা এবং লা আলবিসেলেস্তেরা ফাইনালে মুখোমুখি হয়, তবে ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের পর এটিই হবে তাদের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ, যেখানে দক্ষিণ আমেরিকার দলটি ২-১ ব্যবধানে জয়ী হয়েছিল।
এই ম্যাচটির আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো, বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন এবং বিশ্বের চ্যাম্পিয়ন দল একে অপরের বিরুদ্ধে ফাইনাল খেলবে।
যদি স্পেন এই ম্যাচে জয়ী হয়, তবে তারা দুটি শিরোপা নিয়ে ফ্রান্স ও উরুগুয়ের সমকক্ষ হবে। আর আর্জেন্টিনার জয় মানে হবে তাদের চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা, যা তাদের জার্মানি ও ইতালির সমান সারিতে নিয়ে যাবে। তখন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের চেয়ে মাত্র একটি শিরোপা পিছিয়ে থাকবে আর্জেন্টিনা।
এই সম্ভাব্য ম্যাচটির আরেকটি বড় দিক হলো, এটি ভিন্ন দুই প্রজন্মের দুই সুপারস্টার—লিওনেল মেসি এবং লামিন ইয়ামালকে প্রতিপক্ষ হিসেবে একই মাঠে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে।



