নদীবেষ্টিত অঞ্চল বরিশালে ১৭ বছরের রাজনৈতিক জড়তা কাটিয়ে এখন বইছে নির্বাচনী হাওয়া। একটি সিটি করপোরেশন ও ১০টি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই জেলার ছয়টি আসনেই প্রচার-প্রচারণা তুঙ্গে। স্বাধীনতার পর থেকেই বরিশাল অঞ্চলটি বিএনপির ঘাঁটি। তাদের সঙ্গে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আওয়ামী লীগ। কয়েকটি আসনে জাতীয় পার্টিরও অবস্থান ছিল ভাল।
এবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের কথা। তবে এবারের নির্বাচনে ইসলামী দলগুলোর শক্ত অবস্থান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে ভোটের সমীকরণ অনেকটা ভিন্ন রকম হয়ে গেছে।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে আলোচনা থেকে দেখা গেছে, জেলার তিনটি আসনে সুষ্পষ্টভাবে এগিয়ে আছে বিএনপি। দুটি আসনে বিএনপিকে ভালভাবেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। আরেকটি আসনে বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করবেন একই দলের বিদ্রোহী এক স্বতন্ত্র প্রার্থী।
প্রসঙ্গত, চরমোনাইর পীরের কারণে দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে বরিশাল অঞ্চলে ইসরামী আন্দোলনের ভোট ও প্রভাব বেশি। এবার বরিশাল জেলার সবগুলো আসনেই প্রার্থী দিয়েছে এই দল। এর মধ্যে চরমোনাইর বর্তমান পীর ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির সৈয়দ রেজাউল করিম নির্বাচন করছেন না। তবে তার ভাই ও দলের নায়েবে আমির সৈয়দ ফয়জুল করিম দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া)
দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার প্রার্থী সংখ্যা ৪ জন। মূল লড়াই হচ্ছে ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন এবং একই দলের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহানের মধ্যে। এরই মধ্যে তাদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা। দুজনের পক্ষে কাজ করছেন বিএনপির দুটি অংশ।
এখানে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা কামরুল ইসলাম খান ও ইসলামী আন্দোলনের রাসেল সরদার মেহেদী। তবে মূল লিড়াইয়ে তারা জায়গা করে নিতে পারছেন না।
বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া)
এই আসনে নির্বাচনী মাঠে আছেন ৮ জন প্রার্থী। এখানে বিএনপির প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু। বিএনপিতে কোনো বিদ্রোহ না থাকায় স্পষ্টতই এগিয়ে আছেন তিনি। এখানে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ নেছার উদ্দিন ও জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল মান্নান। তবে ভোটের মাঠে তারা খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারছেন না। দলীয় ঐক্য ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় জয়ের দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে সরদার সান্টু।
বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী)
বাবুগঞ্জ-মুলাদী আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৬ জন প্রার্থী। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রবীণ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন। তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইসলামী আন্দোলনের সিরাজুল ইসলাম ও জামায়াত জোটের এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। এ ছাড়া কারাগারে থেকে নির্বাচন করছেন জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু। তবে দলীয় সংহতির কারণে শক্তিশালী অবস্থানে আছেন বিএনপির জয়নুল আবেদীন।
বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ)
মেঘনা ও আড়িয়াল খাঁ নদীবেষ্টিত এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ৫ জন। বিএনপির তরুণ প্রার্থী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান। তার বিপরীতে লড়ছেন চরমোনাই পীরের ভাই ও ইসলামী আন্দোলনের মুফতি সৈয়দ এছহাক মো. আবুল খায়ের এবং জামায়াতের মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার। তবে বিএনপির অত্যন্ত শক্ত ঘাঁটি এই আসনে অনেকটা এগিয়ে আছেন বিএনপির রাজীব আহসান। ২০০৮ সালের বিপর্যয়ের নির্বাচনেও বিএনপি এই আসনে জয়ী হয়েছিল।
বরিশাল-৫ (সদর ও সিটি করপোরেশন)
বরিশাল জেলার সবচেয়ে আলোচিত এই আসনে প্রার্থী সংখ্যা ৬ জন। এখানে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী ও সাবেক মেয়র মজিবর রহমান সরোয়ারের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মো. ফয়জুল করীমের মধ্যে তুমুল লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই আসনে জামায়াত জোটগতভাবে কোনো প্রার্থী দেয়নি। ফলে জামায়াতের ভোট পেতে পারেন ফয়জুল করীম। অন্যদিকে শ্রমজীবী ভোটারদের মাঝে জনপ্রিয় মুখ বাসদের মনীষা চক্রবর্তী। তিনি বিএনপির কিছু ভোটে ভাগ বসাতে পারেন। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রে গেলে তাদেরও সমর্থন পাবেন তিনি।
এই আসনে ১৯৯১ সালে প্রথমবার উপনির্বাচনে জয়লাভের পর ১৯৯৮ সালে দ্বিতীয়বার উপনির্বাচনেই জয়লাভ করেছিলেন বিএনপির মজিবুর রহমান সারোয়ার। এরপর জিতেছেন ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে। তবে এবার বেশ ভাল রকম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন বিএনপির এই হেভিওয়েট প্রার্থী।
বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ)
বাকেরগঞ্জ আসনেও ৬ জন প্রার্থী লড়াই করছেন। এখানে বিএনপির জেলা আহ্বায়ক আবুল হোসেন খানের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইসলামী আন্দোলনের মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম। এখানে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা মাহমুদুন্নবী।
এই আসনে বিএনপি-আওয়ামী লীগের পরে জাতীয় পার্টিরও উল্লেখযোগ্য ভোট রয়েছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তাদের কোনো প্রার্থী নেই। স্থানীয় অনেক ভোটারের বিশ্বাস, জাতীয় পার্টির সমর্থকদের একটি অংশের ভোট পেতে পারেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী।
অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলনেরও কিছু ভোট জামায়াতের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। শেষ পর্যন্ত এই আসনে বিএনপি ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে তুমুল লড়াইয়ের আভাস দিয়েছেন তারা।


