কদিন আগেও রামিসা ছিল ফুলের মতো কোমল এক শিশু। কিন্তু গত কয়েকদিনের সংবাদ শিরোনামে সে কেবলই একটি সংখ্যা; মা-বাবার চোখের জল হয়ে আছে সে–এক নৃশংস ধর্ষণের শিকার হয়ে আজ সে বেঁচে নেই। এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। দেশের নানা প্রান্তে প্রতিদিন এমন রোমহর্ষক ঘটনা ঘটছে, যার হিসাব রাখার ক্ষমতাও যেন আমরা হারিয়ে ফেলেছি।
আমরা চিৎকার করি, ‘ধর্ষকের ফাঁসি চাই, বিচার চাই’। কিন্তু এই বিচারের পরেও আবার কেন একই ঘটনা ঘটে? কেন প্রতিদিন নতুন নতুন রামিসা, নতুন নতুন জাহাঙ্গীরনগরের সেই ছাত্রী ট্র্যাজেডির চরিত্র হয়ে ফিরে ফিরে আসে?
উত্তর একটাই। আমরা বিচারের দাবি জানাই, কিন্তু সমাজকে বাসযোগ্য রাখার ক্ষেত্রে সমাজপতিদের দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করতে পারি না। বিচারিক প্রক্রিয়া চলবে। ধর্ষক ইতিমধ্যে ধরা পড়েছে, হয়তো শাস্তিও হবে; কিন্তু রামিসাকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। যে ফুল ঝরে গেছে, সে আর কখনো ফুটবে না। তাই বিচার যেমন জরুরি, ঠিক তেমনি জরুরি আর কোনো ফুল ঝরে যাওয়ার আগে প্রতিরোধ। প্রতিরোধের এই দায়িত্ব কেবল আইনের নয়; প্রতিটি নাগরিক সংগঠনের, সমাজের তথাকথিত ‘সমাজপতি’দের, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, অভিভাবকের, মসজিদ-মন্দিরের ইমাম ও পুরোহিতের, এমনকি আমাদের প্রতিবেশীরও।
যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতকে একা ছেড়ে দিই, তবে সমাজের ভেতরের দানবকে কখনো শায়েস্তা করা যাবে না।
সমাজপতিরা যেখানে ব্যর্থ
যারা সমাজের নেতা, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি—তাদের চুপ থাকাটাই যেন অপরাধের পরোক্ষ সমর্থনে পরিণত হয়। সত্যটা হলো, আমাদের সমাজে এখনো নারী ও শিশুর শরীর কিংবা পোশাক নিয়ে ‘কী পরেছে’, ‘কোথায় গিয়েছিল’, ‘কেন রাতে বেরিয়েছিল’- এসব প্রশ্ন ওঠে। প্রতিবাদে গলা ফাটানোর আগে কেউ কেউ ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ বা ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা শুরু করে। সমাজপতিরা নীরব থাকলে অপরাধীর সাহস বাড়ে।
আমাদের গ্রাম-শহরের ‘সমাজের বড় ভাই’, ‘কমিউনিটি লিডার’, ‘শিক্ষক নেতা’ — তারা যদি প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনায় দমে না গিয়ে প্রতিবাদ করেন, যদি ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানোর সাহস দেখান, তাহলে অপরাধী বুঝবে। ‘এই সমাজ তাকে আর প্রশ্রয় দেবে না’।
সামাজিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন কী করতে পারে? এসব সমস্যা আমাদের সমাজে নিত্য। তাই বলে তো আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না। এক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্ব অনেক:
প্রতিরোধে সচেতনতার সংস্কৃতি গড়া
প্রতিটি মহল্লায় নারী ও শিশু নিরাপত্তা নিয়ে সামাজিক সংগঠনগুলো নিয়মিত সভা করবে। সাংস্কৃতিক সংগঠন নাটক, গান, পথনাটক কিংবা ওয়াজ-মাহফিলের মাধ্যমে শিশুদের ‘গুড টাচ-ব্যাড টাচ’ শেখাবে। স্কুল-কলেজে বাধ্যতামূলক যৌন নিরাপত্তা শিক্ষা চালু করতে সমাজপতিরা চাপ দেবেন।
পাবলিক প্লেস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা প্রমাণ করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসও আজ নিরাপদ নয়। ক্যাম্পাস, পার্ক, গণপরিবহন–প্রতিটি জায়গায় সিসিটিভি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত আলো, পুলিশি টহল ও দ্রুত জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে সমাজের নেতাদের ভূমিকা রাখতে হবে।
নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনের সঙ্গে যৌথ কমিটি
প্রতিটি থানায় ওয়ার্ড পর্যায়ে একটি ‘নারী ও শিশু নিরাপত্তা টাস্কফোর্স’ গঠন করতে হবে স্থানীয় সমাজপতি ও নাগরিক সংগঠনগুলোর। ঘটনার পর প্রশাসন যখন বিলম্ব করে, এই কমিটি তখন তা নজরদারি করবে, রিপোর্ট করবে এবং ভুক্তভোগীর পরিবারকে আইনি সহায়তা দেবে।
ভুক্তভোগী ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানো
আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা—ঘটনার পর সমাজ ভুক্তভোগীকে একা করে দেয়। সমাজপতিরা দায়িত্ব নেবেন, যাতে ভুক্তভোগী বা তার পরিবার সামাজিকভাবে বয়কটের শিকার না হয়। তারা যেন স্কুলে পড়তে পারেন, চাকরি পান এবং মানসিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা পান।
অপরাধীকে সমাজে ফিরে আসা কঠিন করা
ধর্ষক গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে এলেই অনেক সময় এলাকায় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। যেমন-এই ঘটনার ঘাতক সোহেল রানাও একবার একই রকম অপরাধ করে জেল থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছিল। সামাজিক সংগঠন যদি তাকে ‘বয়কট’ ঘোষণা করে, তার পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তবে অপরাধীর পুনরায় অপরাধ করার সম্ভাবনা কমে যায়।
সমাজপতিদের নীরবতা ‘অপরাধের সঙ্গী’
আমি জানি, অনেকে বলবেন-বিচার তো হবেই। কিন্তু সেই ফুল তো আর ফিরবে না। রামিসাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না কোনো রায়। সমাজপতি মানে শুধু বিচারকের চেয়ার নয়, সমাজপতি মানে বিবেক। আর যার বিবেক জাগ্রত, তিনি এই নৃশংসতা থামাতে পারেন–কেবল প্রতিবাদে নয়, কাজে।
আমরা নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার পূর্ণ অবসান ঘটাতে পারি, যদি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ‘নিরাপত্তার স্বাভাবিক সংস্কৃতি’ গড়ে তোলা যায়।
একসঙ্গে বাঁচতে হলে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। শুধু আইন করে, ফাঁসি দিয়ে বা সাজা দিয়ে সমাজ বদলায় না। সমাজ বদলায় প্রতিটি মানুষের মানসিকতায়, সামাজিক রীতিনীতিতে এবং আমাদের একে অপরের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণে।
আপনি সমাজের একজন মানুষ–অভিভাবক, শিক্ষক, প্রতিবেশী, ব্যাংকার, ডাক্তার, সাংবাদিক, শিল্পী কিংবা নেতা। আপনার একটি কথা, একটি প্রতিবাদ, একটি সচেতন পদক্ষেপ কারও জীবন বাঁচাতে পারে।
আর কোনো ফুল ঝরবে না–এই প্রত্যয় আজ তৈরি করতে হবে। বিচার যেমন হবে, তেমনি প্রতিরোধও হবে। এবার শুধু রাষ্ট্র নয়, সমাজ নিজে দায়িত্ব নেবে।
আজ থেকেই। আমাদের প্রতিবেশী থেকে শুরু হোক। রামিসার পরিবার আর কাঁদবে না, জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্রী আর ভয় পাবে না। আমরাই তৈরি করব এমন এক সমাজ, যেখানে নারী ও শিশু নিরাপদ, যেখানে সবার বিবেক জাগ্রত।
লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, টাইমস অব বাংলাদেশ


