বছরের পর বছর প্রতীক্ষা, মাসের পর মাস বিতর্ক আর সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে জমতে থাকা টানটান উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে মাঠে গড়াচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ। বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে (যা স্পনসরশিপের কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে এস্তাদিও বানোর্তে নামে পরিচিত) উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোর মুখোমুখি হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা।
আগামী ছয় সপ্তাহ ধরে পুরো বিশ্বের নজর থাকবে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই টুর্নামেন্টের দিকে, যেখানে তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে মোট ১০৪টি ম্যাচ খেলা হবে।
যেকোনো মাপকাঠিতেই এবারের আসরটি ঐতিহাসিক। প্রথমবারের মতো প্রচলিত ৩২টি দলের পরিবর্তে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল, যার ফলে ম্যাচের সংখ্যায় যেমন রেকর্ড হচ্ছে, তেমনি কুরাসাও ও কেপ ভার্দের মতো ফুটবল অঙ্গনের নবাগত দেশগুলোও বিশ্বমঞ্চে পা রাখার সুযোগ পাচ্ছে।
ফিফা সভাপতি জান্নি ইনফান্তিনো ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, স্টেডিয়ামের গ্যালারি মাতাবেন ৭০ লাখ দর্শক। বিশ্বজুড়ে পর্দার সামনে চোখ রাখবেন আরও প্রায় ৬০০ কোটি। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, ‘এটি হতে যাচ্ছে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ফিফা বিশ্বকাপ।’
তবে এই টুর্নামেন্ট সত্যিই সেই উচ্চতা ছুঁতে পারবে কি না, তা এখনো একটি রোমাঞ্চকর ও উন্মুক্ত প্রশ্ন।
ফুটবল ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে এবার তিনটি স্বাগতিক দেশের জন্য থাকছে তিনটি আলাদা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। মেক্সিকোর আজকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি হতে যাচ্ছে এক জমকালো প্রদর্শনী। মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ শুরুর আগে তারকাখচিত এক সংগীতানুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ হিসেবে মঞ্চ মাতাবেন কলম্বিয়ান সুপারস্টার শাকিরা।
মেক্সিকো সিটির রাস্তাঘাট সেজেছে নতুন রূপে—ফিফার চেনা অরেঞ্জ গাঁদা ফুলের ব্র্যান্ডিং, বিশালাকার ফুটবল আর রঙিন সাজসজ্জায় সেজে উঠেছে রাজপথগুলো। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা হাজারো ভক্তে মুখরিত রাজধানী, প্রত্যেকেই নিজ নিজ দলের জার্সির রঙে মোড়ানো বিখ্যাত স্মৃতিস্তম্ভগুলোর সামনে ছবি তুলতে ব্যস্ত।
এই উন্মাদনা যেমন বাস্তব, তেমনি সংক্রামক। বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, পুরো আমেরিকা অঞ্চলের বিমানবন্দরগুলোতে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, স্পেন, জার্মানির মতো পরাশক্তিদের জার্সি গায়ে দিয়ে দলে দলে ভক্তদের বহির্গমন গেট পার হতে দেখা গেছে। লস অ্যাঞ্জেলেসের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া বুয়েনস আইরেসের ২৯ বছর বয়সী সমর্থক এমিলিও সোসা বলেন, ‘এবার আমরা শিরোপা ধরে রাখার লড়াই করছি এবং আর্জেন্টিনার সমর্থনে আমরা পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যেতে রাজি।’ ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা এবারও ফেবারিটের তালিকায় থাকবে, তবে এবার তাদের এমন এক টুর্নামেন্ট পার হতে হবে যার গভীরতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
যে গল্পগুলো এই টুর্নামেন্টের ভাগ্য নির্ধারণ করবে:
বিশ্বকাপের যেকোনো বিশ্লেষণেই এমন এক মানুষের নাম বাদ দেওয়া অসম্ভব, যিনি পুরো একটি প্রজন্ম ধরে এই খেলাটিকে শাসন করেছেন। ৩৮ বছর বয়সে লিওনেল মেসি মাঠে নামছেন, যা নিশ্চিতভাবেই তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। ফুটবল ঈশ্বর কি তার ঝুলিতে শেষ একটি জাদুকরী অধ্যায় জমা রেখেছেন? এটিই এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আকর্ষক উপাখ্যান। তার চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই ৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। রেকর্ড ভাঙা-গড়ার এক অবিশ্বাস্য ক্যারিয়ারে এখনো তার একমাত্র অধরা ট্রফিটির পেছনে ছুটছেন তিনি।
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, যারা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো শিরোপার মুখ দেখেনি, তারা এই দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক খরা কাটানোর দায়িত্ব সঁপেছে ইতালিয়ান কোচিং কিংবদন্তি কার্লো আনচেলত্তির ওপর। অন্যদিকে, ৬০ বছরের শিরোপাহীনতার আক্ষেপ মেটানোর স্বপ্ন নিয়ে জার্মান ম্যানেজার টমাস টুখেলের অধীনে মাঠে নামছে ইংল্যান্ড।
বিতর্কের বোঝা পিঠে নিয়ে বিশ্বকাপ:
উদ্বোধনী দিনের সমস্ত আনন্দ-উল্লাসের মাঝেও, এই বিশ্বকাপটি সম্ভবত আগের যেকোনো আসরের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক এবং ব্যবস্থাপনাগত চাপ নিয়ে হাজির হয়েছে। দল বাড়ানোর এই নতুন ফরম্যাট অন্তর্ভুক্তির দিক থেকে প্রশংসিত হলেও, সমালোচনার মুখে পড়েছে।
সমালোচকদের মতে, ৩২ থেকে দল বাড়িয়ে ৪৮টি করায় টুর্নামেন্টের শুরুর দিকের ম্যাচগুলোর মান কমে যাবে। বড় দলগুলো নকআউট পর্বের আগ পর্যন্ত একে অপরের মুখোমুখি হচ্ছে না বললেই চলে, যা বিশ্বকাপের আসল উত্তেজনাকে শেষ ষোলোর রাউন্ড পর্যন্ত পিছিয়ে দিচ্ছে।
বিখ্যাত ফুটবল লেখক জোনাথন উইলসন এপি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বিশ্বকাপ যেন সত্যিকার অর্থেই সবার প্রতিনিধিত্ব করে তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এটি যে বিশ্বের সেরা দল নির্ধারণের একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট, সেই বিষয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকা উচিত ছিল।’
টিকিটের চড়া মূল্য আরেকটি বড় অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত জানুয়ারিতে যখন সাধারণ টিকিট বিক্রি শুরু হয়, তখন এর দাম ছিল ১৪০ ডলার থেকে ৮,৬৮০ ডলার পর্যন্ত—যা পরবর্তীতে আরও আকাশচুম্বী হয়েছে। সমর্থকেরা ফিফার বিরুদ্ধে ‘মহা-বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ এনেছেন। চড়া দামের কারণে খেলা দেখার সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়েছেন বহু সাধারণ সমর্থক।
মেক্সিকো সিটির ৬৬ বছর বয়সী চিকিৎসক হোসে লুইস মুনিয়োজ, যিনি ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে তার ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে মাঠে যাওয়ার মধুর স্মৃতি হাতড়াচ্ছিলেন, তিনি এপি’কে বলেন, টিকিট না পেয়ে এবার তাকে ঘরে বসেই খেলা দেখতে হবে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘টিকিটের দাম আকাশছোঁয়া। বিপুল অর্থের মালিক কোনো বিদেশি না হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে যাওয়া অসম্ভব। এটি খুবই বৈষম্যমূলক মনে হচ্ছে।’
তবে ঘরে বসেই তিনি সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে বসার ঘর থেকেই দলের জন্য গলা ফাটাবেন।
স্বাগতিক মেক্সিকো নিজেও এখন একটি সংবেদনশীল সময় পার করছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শিনবাউমকে শিক্ষক ইউনিয়নের বিক্ষোভ, সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে সমালোচনা এবং চলতি বছরের শুরুর দিকে স্বাগতিক শহর গুয়াদালাহারায় ঘটে যাওয়া সহিংসতার পর নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। মেক্সিকোর তিনটি স্বাগতিক শহর জুড়ে এক লাখেরও বেশি নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই টুর্নামেন্ট শিনবাউমকে যেমন প্রচণ্ড চাপের মুখে ফেলেছে, তেমনি এটি একটি বড় সুযোগও বটে। একটি নির্বিঘ্ন ও সফল টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে পারলে তা মেক্সিকোর সক্ষমতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে পুরো বিশ্বের কাছে এক শক্তিশালী বার্তা পাঠাবে।
ফুটবল শুরু হলে সবকিছু বদলে যায়:
এই বিশ্বকাপকে ঘিরে যতই বিতর্ক বা শোরগোল থাকুক না কেন, কোটি কোটি মানুষের চোখ এই টুর্নামেন্টে আটকে থাকার একটি অমোঘ কারণ রয়েছে। আজ রাতে যখন আজতেকা স্টেডিয়ামে রেফারির উদ্বোধনী বাঁশি বাজবে, তখন সমস্ত বিতর্ক অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও আড়ালে চলে যাবে। রাজনীতির সব জটাজাল ছিন্ন করে ফুটবলই পারে বিশ্ববাসীকে আরও একবার মনে করিয়ে দিতে—কেন তারা প্রথম দেখায় এই সুন্দর খেলাটির প্রেমে পড়েছিল।
কিছু কিছু ভেন্যুতে তীব্র গরমের মুখোমুখি হতে হবে খেলোয়াড়দের। তিনটি দেশ জুড়ে টুর্নামেন্ট আয়োজনের ব্যবস্থাপনাগত জটিলতাও নজিরবিহীন। এর বাণিজ্যিক চাকচিক্যও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জাঁকজমকপূর্ণ। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও, আগামী ১৯ জুলাই কোনো একটি দল উঁচিয়ে ধরবে ক্রীড়া জগতের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সেই সোনালী ট্রফি। পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছে মহাজাগতিক এক শো। এবার মাঠের ফুটবলকেই কথা বলতে দেওয়া হোক।


