আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার যে ব্যয়ের পরিকল্পনা করতে যাচ্ছে তার অর্ধেকেরই বেশি দারিদ্র্য বিমোচন সম্পর্কিত খাতে ব্যয় হতে যাচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে দারিদ্র্য নিরসন খাতে মোট বরাদ্দ থাকছে ৫ লাখ ৪০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫৭ শতাংশেরও বেশি।
এর মধ্যে সরাসরি অর্থ বিতরণের ‘সামাজিক নিরাপত্তা’ খাতের বাজেটই হলো ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাজেটের সামগ্রিক কাঠামো দরিদ্রমুখী হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।’
বাজেটের প্রকৃত ফলাফল শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করবে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে এবং পণ্যের দাম আরও বেড়ে যায়, তাহলে ভ্যাট কমানোর সুফল অনেকটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’
দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য ২০২২ সালের পর থেকে অনেকটাই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। করোনাভাইরাস মহামারী শেষে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের পর জ্বালানির দামে লাফের পর উচ্চ মূল্যস্ফীতির বৃত্তে আটকে পড়েছে বাংলাদেশ। মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়ায় দারিদ্র্য বিমোচনের গতিতে কেবল ছেদ পড়েনি, দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক এক প্রতিবেদনে বলেছে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ২০২৬ সালে অতিরিক্ত ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্য বিমোচনের সুযোগ হারাতে পারে।
ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা বৃদ্ধি: নারী-কেন্দ্রিক সরাসরি অর্থায়ন
বিএনপির ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি ছিল প্রান্তিক ৫০ লাখ পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দিয়ে মাসে ২৫০০ টাকা বা সমতুল্য পণ্য দেওয়া ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়ানো।
সরকারের ফ্ল্যাগশিপ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ সুবিধাভোগীর জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, ‘সরকার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়েই বাজেট পরিকল্পনা করেছে বলে মনে হয়। তবে রাজস্ব ঘাটতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হলে অর্থনৈতিক বাস্তবতা এসব উদ্যোগের বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।’
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতেও ভাতা বাড়ানো হয়েছে। ৬২ লাখ বয়স্ক মানুষের জন্য ভাতা বাড়িয়ে ৭০০ টাকা (বরাদ্দ ৫,২৩৯ কোটি টাকা), ৩০ লাখ বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীর জন্য ভাতা ৭০০ টাকা (বরাদ্দ ২,৫৩৫ কোটি টাকা) এবং ৩৯ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ভাতা বাড়িয়ে ১০০০ টাকা (বরাদ্দ ৪,৭১৫ কোটি টাকা) করা হয়েছে।
ইশতেহারের বাইরে গিয়েও বাজেটে কিছু কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। প্রথমবারের মতো কনজ্যুমার প্রাইস ইনডেক্স এর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি বছর সামাজিক নিরাপত্তার ভাতাগুলোর পরিমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, ‘অন্যান্য খাতেও গত বছরের তুলনায় থোক বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে নির্দিষ্ট খাতে ব্যয়ের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া থোক বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানো কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।’
কৃষক কার্ড ও গ্রামীণ দারিদ্র্য: আশার আলো
বিএনপি সরকারের ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি কৃষকদের ‘কৃষক কার্ড’, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ ও কৃষি বিমা।
সরকার ৪২ লাখ ৫র হাজার প্রান্তিক কৃষকের জন্য বাজেটে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষকরা বছরে ২৫০০ টাকা নগদ সহায়তাসহ কৃষি উপকরণ, বিমা ও ডিজিটাল বাজারের সুবিধা পাবেন।
এ ছাড়া গ্রামীণ কর্মসংস্থানের জন্য দেশজুড়ে ‘খাল কাটা’ কর্মসূচি শুরু হয়েছে, যার লক্ষ্য ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা।
অর্থনীতির শিক্ষক শাহাদাত সিদ্দিকী বিশ্লেষণ হচ্ছে, সরকার কৃষি ও গ্রামীণ খাতকে বেশ গুরুত্ব দিয়েছে। কৃষক কার্ড চালু এবং সেচ ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে খাল কাটা কর্মসূচির মতো উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে যে, গ্রামীণ অর্থনীতি সুরক্ষায় সরকার ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এগোচ্ছে।
বেকার ভাতায় বরাদ্দ নেই
ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি ছিল বেকার ভাতা চালু, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, ২৭ লাখ বেকারের সমাধান। তবে বাজেটে সরাসরি বেকার ভাতা বা যুব মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ নেই। অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে (EGPP) ১ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যেখানে ৩ লাখ ৭০ হাজার লাখ মানুষের জন্য দৈনিক মজুরি বাড়িয়ে ৫০০ টাকা করা হয়েছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক কল্যাণ রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে ২ লাখ ৫৬ হাজার ধর্মীয় নেতার (মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের সেবক) জন্য ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার কথা বলা হয়েছে, যেখানে তারা মাসে ২০০০ হাজার থেকে ৫০০০ টাকা করে সম্মানি পাবেন।


