আগামী ২৩ জুন আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলটির যেকোনো তৎপরতা রুখে দিতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও ধরপাকড় শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, সরকারের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে সপ্তাহব্যাপী নানা কর্মসূচি পালনের জন্য ফেসবুকের মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এরপর ২০২৫ সালের ১২ মে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দলটির সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে, যা পরবর্তীতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সংসদেও পাস হয়। ১৯৪৯ সালে যাত্রা শুরু করা এই দলটি ইতিহাসে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো নিষিদ্ধ হলো। এরই মাঝে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের পরিকল্পনা করছে আওয়ামী লীগ।
এই পরিস্থিতিকে সামনে রেখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগকে ‘মাফিয়া দল’ আখ্যা দিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানান, ২৩ জুনকে টার্গেট করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ দেশে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। পুলিশকে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, নিষিদ্ধ কোনো দলকে প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি করতে দেওয়া হবে না।
আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেজে ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ক্ষতিগ্রস্ত বঙ্গবন্ধু ভবনে এবং বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও দোয়া। এ ছাড়া টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা, দেশের সব মসজিদে দোয়া এবং অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার পাশাপাশি গরিবদের মাঝে খাবার বিতরণের কথা বলা হয়েছে।
দলগতভাবে পতাকা মিছিল, পোস্টার সাঁটানো, লিফলেট বিতরণ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একই ধরনের প্রোফাইল পিকচার ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। এর বাইরে ২৩ জুন থেকে দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের আলোচনা সভায় যোগ দেবেন বলে জানা গেছে।
সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ শীর্ষ নেতা গোপনে দেশ ছেড়েছেন এবং অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। এর মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আদালতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন, আরও কয়েকটি মামলায় তার সাজা হয়েছে। তাকে ফিরিয়ে দিতে সরকার ভারতকে একাধিকবার তাগিদ দিয়েছে।
তবে দলীয় নেতারা বলছেন, শেখ হাসিনা নিজেও দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হতে চান। এই খবর আসার পর থেকে সাজা বাতিল ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই মিছিল হচ্ছে। রোববার গাজীপুরে যুবলীগের এমন একটি মিছিল থেকে পুলিশকে পেটানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের কর্মসূচির কারণে দেশে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ও নাশকতার আশঙ্কা করছে পুলিশ। তাই দেশজুড়ে নিরাপত্তা এবং টহল জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনকে কোনোভাবেই প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া হবে না। এজন্য পুলিশের সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে। গোয়েন্দা তৎপরতা এবং অভিযানও বাড়ানো হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদরদপ্তরের এক গোপন চিঠিতে সব জেলার পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য সব ধরনের মিছিল-মিটিং রুখে দিতে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর বিপরীতে ভারত থেকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম টাইমস’কে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অসাংবিধানিক এবং বেআইনি। অতীতেও অনেকবার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, লাভ হয়নি। এবারও গণজাগরণের মধ্য দিয়ে দল ঘুরে দাঁড়াবে।’
দলের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী টাইমস’কে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ গণমানুষের দল। ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এর সঙ্গে বাংলাদেশের জন্মের সম্পর্ক। সরকারের অন্যায় সিদ্ধান্ত ও আচরণের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।’
দলের অন্য নেতারা জানিয়েছেন, তারা এখনই সরকারের বিরুদ্ধে বড় কোনো আন্দোলনে যেতে চান না, বরং সংগঠন গোছানোর কাজ করছেন। বিশেষ করে ঢাকার পাশে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার এলাকায় গোপনে সাংগঠনিক কাজ চালানো হচ্ছে, যা দলের শীর্ষ নেতারা তদারকি করছেন। স্বয়ং শেখ হাসিনাও মোবাইল ফোনে নির্দেশনা দিচ্ছেন।
তবে প্রশাসন কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। দেশের শান্তি বজায় রাখতে আওয়ামী লীগকে শক্ত হাতে দমনের প্রস্তুতি নিয়েছে পুলিশ।


