পুলিশের নতুন প্রবর্তিত পোশাক নিয়ে খোদ বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেই অসন্তোষ ও আপত্তি দেখা দিয়েছে। রঙ ও কাপড়ের গুণমান নিয়ে কনস্টেবল থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অনেকেই নাখোশ। পুলিশের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলো জানিয়েছে, তারা পুরোনো রঙের পোশাকেই ফিরে যেতে আগ্রহী। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, অনেক সদস্য নতুন ‘আয়রন গ্রে’ পোশাকের বদলে আগের নীল ও সবুজ রঙের পোশাক পরেই দায়িত্ব পালন করছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের কিছু সদস্যের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর অন্তর্বর্তী সরকার তড়িঘড়ি করে পোশাকের রঙ বদলের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে সীমিত পরিসরে এই নতুন পোশাক চালু হয়।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, রঙ বদলালেই কি পুলিশের আচরণ বদলানো সম্ভব? এ ছাড়া কাপড় ও জুতা সরবরাহের কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠান দুটির মালিকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা ও চেক জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটিই এখন বিতর্কের মুখে।
কাপড় ও জুতা কেনায় যত বিতর্ক
পুলিশের নতুন পোশাকের কাপড় সরবরাহের ১৪১ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে নোমান গ্রুপ। এই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘোষিত আয়ের বাইরে প্রায় ১৯ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আদালতের নির্দেশে তার দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
যদিও নোমান গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান তালহা স্পিনিং ও তালহা ফ্যাব্রিকসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার বাবলু মন্ডল দাবি করেছেন, তারা পোশাকের মান নিয়ে কোনো অভিযোগ পাননি। প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. বাবর খান জানান, রোদ-বৃষ্টিতে ডিউটি করার কথা মাথায় রেখে বিশেষ ‘হারকোমা জার্মান’ রঙ ও ২৪০ জিএসএমের কাপড় ব্যবহার করা হয়েছে, যা বেশ ব্যয়বহুল ও আরামদায়ক।
অন্যদিকে, প্রায় ১০৫ কোটি টাকার জুতা ও তোয়ালে সরবরাহের কাজ পেয়েছে ফ্রেন্ডস ট্রেডিং করপোরেশন। এই প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী গাজী তৌকির রহমান শুভর বিরুদ্ধে ২০২০ সালে ৫৫ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল বরিশালের আদালত। মামলার বাদী কাজী আতিকুর রহমানের আইনজীবী জানান, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে টাকা নিয়ে পরে পাওনা পরিশোধে টালবাহানা করায় এই মামলা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোনো ট্যানারি বা জুতা তৈরির কারখানাও নেই।
সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের বক্তব্য
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে অহেতুক বলে মনে করেন সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা। তিনি ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, এভাবে তড়িঘড়ি করে পোশাক বদলের কোনো প্রয়োজন ছিল না। মানুষের মানসিকতা ও আচরণের পরিবর্তন না হলে শুধু পোশাকের রঙ বদলে ভালো কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন জানান, নতুন আইজিপি সবেমাত্র যোগ দিয়েছেন। পোশাক নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।
কেনাকাটার বিষয়টি পুলিশের লজিস্টিকস বিভাগ দেখাশোনা করে। তবে লজিস্টিকস ও অ্যাসেট অ্যাকুইজিশন বিভাগের অতিরিক্ত আইজিপি মোসলেহ উদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ডিআইজি (লজিস্টিকস) সারওয়ার মুর্শেদ শামীম অবশ্য দাবি করেছেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সঙ্গেই সম্পন্ন হয়েছে। কারো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে লিখিতভাবে জানালে তদন্ত করা হবে।
আগের পোশাকেই ঐতিহ্যের প্রতিফলন
বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন পৃথক বিবৃতিতে পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছে। সংগঠন দু’টির বিবৃতিতে বলা হয়, ২০০৩-২০০৪ সালে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে আবহাওয়া ও পেশাদারত্বের কথা মাথায় রেখে আগের পোশাকটি নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাহিনীর সদস্যরা মনে করেন, সেই পোশাকটি তাদের ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্বের প্রতীক। বিপুল অর্থ ব্যয়ে পোশাক পরিবর্তন না করে সেই টাকা দিয়ে থানা পর্যায়ের লজিস্টিকস ও যানবাহন সুবিধা বাড়ানোই বেশি যুক্তিযুক্ত ছিল।


