প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে ধরে বিয়ে করেছিলেন জান্নাতুল ফেরদৌস (২৮)। বিয়ের পর জানতে পারেন, স্বামীর আগে আরেকটি বিয়ে রয়েছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। সেই বিরোধের জেরে জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন স্বামী রাজা মিয়া। বেড়ানোর কথা বলে তাকে নৌকায় করে নিয়ে যান কর্ণফুলী নদীতে। সেখানেই শ্বাসরোধে হত্যার পর হাত-পা বেঁধে বস্তাবন্দী করে তার মরদেহ ফেলে দেন খালে।
প্রায় আড়াই মাস পর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের একজন এরইমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম মেট্রো কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, জান্নাতুল নগরের একটি জুতার কারখানায় চাকরি করতেন। তিন বছর আগে প্রথম স্বামীর সঙ্গে তার বিয়েবিচ্ছেদ হয়। পরে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাজা মিয়াকে বিয়ে করেন তিনি। সাত বছর বয়সী মেয়ে তানিসাকে নিয়ে নগরের বহদ্দারহাট সিগন্যাল এলাকায় রাজা মিয়ার সঙ্গে বসবাস করতেন জান্নাতুল।
বিয়ের সময় রাজা মিয়া নিজেকে অবিবাহিত পরিচয় দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে পিবিআই। তিনি শপিং ব্যাগ তৈরি করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করতেন। বিয়ের পর রাজা মিয়ার আগের বিয়ের বিষয়টি জানার পর জান্নাতুলের সঙ্গে তার মনোমালিন্য শুরু হয়।
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, বিরোধের জেরে জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন রাজা মিয়া। এ বিষয়ে পূর্বপরিচিত মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে পরামর্শ করেন তিনি। পরে দুজন কালুরঘাট সেতু এলাকার এক কবিরাজের কাছে গিয়ে ঝাড়ফুঁকসহ বিভিন্ন তান্ত্রিক পদ্ধতির আশ্রয় নেন। তাতেও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় অন্য কোনোভাবে জান্নাতুলকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে বেড়ানোর কথা বলে জান্নাতুলকে কর্ণফুলী নদীর ব্রিজঘাট এলাকায় নিয়ে যান রাজা মিয়া। সেখানে মুসলিম উদ্দিন, আরমান ও রাজা মিয়ার প্রথম স্ত্রীর ভাই শুক্কুর আহমদ একটি সাম্পান নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। নৌকাটি শুক্কুর আহমদের মালিকানাধীন।
পরে জান্নাতুলকে নৌকায় তুলে কর্ণফুলী সেতুর নিচ দিয়ে শিকলবাহা খালের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিন নৌকাতেই রাত ৮টার দিকে জান্নাতুলের সঙ্গে রাজা মিয়ার বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তার মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে খালে ফেলে দেন রাজা মিয়া। এরপর তিনি জান্নাতুলের মুখ চেপে ধরেন। আরমান নামের আরেক ব্যক্তি রশি দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরেন। এতে জান্নাতুলের মৃত্যু হয়। পরে রাজা মিয়া ও আরমান জান্নাতুলের হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে মরদেহ বস্তাবন্দী করেন। এরপর কর্ণফুলী থানাধীন কালারপোল এলাকায় মরদেহ ফেলে তারা পালিয়ে যান।
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ঘটনার চার দিন পর অর্থাৎ গত ২ আগস্ট কর্ণফুলী থানার শিকলবাহা খাল থেকে ভাসমান অবস্থায় বস্তাবন্দী মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে জান্নাতুলের পরিবারের সদস্যরা মরদেহ শনাক্ত করেন। ঘটনার পর থেকে রাজা মিয়ার মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তাকে সন্দেহ করে পরিবার।
এ ঘটনায় জান্নাতুলের মা ছায়রা খাতুন বাদী হয়ে রাজা মিয়া ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে কর্ণফুলী থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে গত ৬ অক্টোবর মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় সদরঘাট নৌ পুলিশ থেকে তদন্তের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়।
পিবিআই জানায়, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে টেকনাফ থানা এলাকায় আত্মগোপনে থাকা মুসলিম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় শুক্কুর আহমদকে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত স্যাম্পান নৌকাটিও তার কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছে।
পিবিআই কর্মকর্তা আরও জানান, বুধবার আদালতে মুসলিম উদ্দিন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে তিনি নিজের সম্পৃক্ততা ও হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন বলে দাবি করেছে পিবিআই। মামলাটির তদন্ত চলছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।


