দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরু হচ্ছে মঙ্গলবার। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ অতিক্রম করল। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে শেষ ধাপের সূচনা।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আগস্টের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে প্রথম ইউনিট আগামী সাড়ে তিন মাসের মধ্যে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ অথবা আগামী বছরের শুরুর দিকে প্রথম ইউনিটটি পূর্ণ সক্ষমতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
কেন্দ্রটি পুরোপুরি চালু হলে দুটি ইউনিট মিলিয়ে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশেরও বেশি পূরণ করবে।
জ্বালানি লোডিং ও পরীক্ষার ধাপ
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান বলেন, রিয়্যাক্টরে জ্বালানি লোডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, ‘জ্বালানি লোডিংয়ের পর চূড়ান্ত নিরাপত্তা বিশ্লেষণ প্রতিবেদন তৈরির জন্য একাধিক পরীক্ষা চালানো হবে।’
জ্বালানি লোডিং উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং রাশিয়ার ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন।
বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি অথরিটি গত ১৬ এপ্রিল প্রথম ইউনিটের জন্য কমিশনিং লাইসেন্স দেয়, যার ফলে জ্বালানি লোডিংয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন মিলেছে।
প্রযুক্তি ও সক্ষমতা
পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত প্রকল্পটি প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে। এখানে আধুনিক রুশ প্রযুক্তির দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে।
বাংলাদেশের গ্রিড কোম্পানি এরই মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সম্পন্ন করেছে।
কর্মকর্তারাও ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। একই সময়ে দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজও এগোচ্ছে দ্রুতগতিতে।
বিদ্যুৎ ঘাটতি ও প্রত্যাশা
২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র মিলিয়ে স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা ৩২,৩৩২ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্রিডভিত্তিক সক্ষমতা ২৮,৯১৯ মেগাওয়াট।
তবে বাস্তবে সর্বোচ্চ উৎপাদন এখন পর্যন্ত ১৬,০০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। এছাড়া ভারতের আদানি পাওয়ার থেকে চুক্তির আওতায় ১,৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে।
এর ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে প্রায় ২,০০০ থেকে ৩,০০০ মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে।
মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বছরের শেষ নাগাদ রূপপুর থেকে ১,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে, যা ধাপে ধাপে পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাবে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
অগ্রগতি সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে সরকারি সময়সীমার চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পারমাণবিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি লোডিংয়ের পর পূর্ণ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা পর্ব শুরু হলে কখনও কখনও কেন্দ্রটি সাময়িকভাবে বন্ধও রাখা হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে একবার বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে এটি প্রায় দেড় বছর মেয়াদি চক্রে ধারাবাহিকভাবে চলবে।’
তিনি ব্যাখ্যা করেন, পারমাণবিক বিভাজনের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম পরমাণু ভেঙে তাপ উৎপন্ন হয়। সেই তাপে পানি উচ্চচাপে বাষ্পে রূপান্তরিত হয়, যা টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এই প্রক্রিয়াটি একটি নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ
বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ক্ষেত্রে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার নির্ধারিত কঠোর নিরাপত্তা মান অনুসরণ করতে হয়।
রূপপুর প্রকল্পে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে—ফুয়েল পেলেট, ফুয়েল ক্ল্যাডিং, রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেল এবং দুটি কনটেইনমেন্ট কাঠামো। এসব ব্যবস্থা বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রীতম কুমার দাস ক্রমাগত নজর রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটির সংবেদনশীলতা বিবেচনায় সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’
কর্মকর্তারা বলছেন, কমিশনিং লাইসেন্স পাওয়ার আগে সব প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা হয়েছে।
জাহেদুল হাছান বলেন, আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত মান বজায় রাখা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি, তবে এখন প্রথম ইউনিট কমিশনিংয়ের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
ইতিমধ্যে ৫৯ জন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ কঠোর আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন পেরিয়ে অপারেটিং লাইসেন্স অর্জন করেছেন।
বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধি
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের সহায়তায় ২০১৩ সালে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়।
২০১৭ ও ২০১৮ সালে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ শুরু হলে ২০২২ ও ২০২৩ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সঞ্চালন লাইন নির্মাণে বিলম্বের কারণে সময়সূচি পিছিয়ে যায়। বর্তমানে প্রকল্পের সময়সীমা ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
এই বিলম্বজনিত মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকল্প ব্যয়ে অতিরিক্ত প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা যোগ হয়েছে, যা প্রাথমিক ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণনির্ভর বিনিয়োগের ওপর বাড়তি বোঝা সৃষ্টি করেছে। সুদসহ মোট ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
সঞ্চালন লাইন নির্মাণে বিলম্ব এক্ষেত্রে একটি বড় কারণ ছিল। তবে বাংলাদেশ গ্রিড কোম্পানি জানায়, ২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে প্রথম ইউনিটের জন্য চারটি লাইন সম্পন্ন হয়েছে—দুটি রূপপুর থেকে বাঘাবাড়ি, একটি বগুড়া এবং একটি গোপালগঞ্জে সংযুক্ত, প্রতিটির সক্ষমতা ৪০০ মেগাওয়াট।
স্থানীয় দক্ষতা গড়ে তোলা
মানবসম্পদ উন্নয়নেও অগ্রগতি হয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ১,৮০০ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাদের মধ্যে ১,১০০ জন দেশ ও বিদেশে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।
বর্তমানে প্রকল্পে প্রায় ৫,০০০ রুশ বিশেষজ্ঞ এবং ২০,০০০ বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন। এছাড়া ভারত ও বেলারুশসহ বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরাও যুক্ত আছেন।
কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশীয় দক্ষ জনবল তৈরি করা হয়েছে এবং ধীরে ধীরে কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
নতুন অধ্যায়
দেশের জ্বালানি খাতে পারমাণবিক শক্তি যুক্ত হওয়ার প্রাক্কালে রূপপুর প্রকল্পটি যেমন বড় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, তেমনি একটি জটিল পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জও।
কর্মকর্তারা বিদ্যুৎ ঘাটতি কমার বিষয়ে আশাবাদী হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ণ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে সময়, সতর্ক পরীক্ষা এবং কঠোর নিরাপত্তা তদারকি অপরিহার্য।


