রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যালটে অনুপস্থিত থাকলেও আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা সারাদেশে এখন ভোটের মাঠে।
দলের ‘নো বোট নো ভোট’ স্লোগান দিয়ে ভোট বর্জনের আহ্বান জানালেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকদের বড় অংশ বিএনপি বা জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন, আবার অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছেন।
সম্প্রতি ঢাকা, মাদারীপুর, রাজশাহী ও ফরিদপুরসহ কয়েকটি এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে।
টাইমস অব বাংলাদেশের অনুসন্ধান বলছে, গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা চাপে রয়েছেন। দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি অংশ বিদেশে অবস্থান করে বেশ আয়েশী জীবন-যাপন করছেন। তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে তাদের নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ফলে, বিদেশ থেকে দলের শীর্ষ নেতাদের নির্বাচন বর্জনের যে আহ্বান রয়েছে তা তৃণমূল আমলে নিচ্ছে না।
মাদারীপুরের শিবচরে গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সাবেক পৌর মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা আওলাদ হোসেন খানের বাসভবনে স্থানীয় বিএনপির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত উঠান বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগ নেতারা বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে ক্যাম্পেইন করেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী লিটনের নির্দেশেই তারা ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী নাদিরা আক্তারের পক্ষে মাঠে নেমেছেন।
সাবেক পৌর কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা আক্তার হোসেন বলেন, ‘আমরা ধানের শীষে ভোট দিয়ে নাদিরা আপাকে জয়যুক্ত করব এবং পৌরসভা থেকে সর্বাধিক ভোট তাকেই দেব। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’
অবশ্য আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ভিন্ন কথা বলছেন। দলটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম টাইমসকে বলেছেন, ‘যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেই সেটি আসলে কোন নির্বাচন নয়। তাদের কর্মীদের কেন্দ্রে যেতে ভয়-ভীতি দেখানো হচ্ছে। তাই আপতত কোন প্রার্থীর পক্ষে কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত তারা ভোটকেন্দ্রে যাবেন না।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমদ টাইমসকে বলেছেন, ‘বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ নেতারা যাই বলুক না কেন তৃণমূলে বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। বড় অংশটি ভোটের মাঠে থাকায় নির্বাচনে ভোটের পারসেন্ট বাড়তে পারে। ফলে, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে। পাশাপাশি এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা কোন একটি আসনের ফলাফল পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন।’
ভোটের মাঠে থাকা সব দল বা প্রার্থীরা এখন দলটির ভোটারদের টার্গেট করছেন। আওয়ামী লীগের ভোটার কজ্বায় নিতে এখন রীতিমত বিএনপি ও জামায়াত উভয়ই কৌশলী বক্তব্য দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের তৃণমূল যে ভোটের মাঠে নেমে পড়েছে তা বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের কথাতেও প্রমাণ মেলে।
জামায়াত ইসলামী কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন টাইমসকে বলেন, ‘দেশের সম্পদ অবৈধভাবে লুটপাট করে যারা বিদেশে আয়েশি জীবনযাপন করছেন তাদের কথা কেন বিপদে পড়ে থাকা আওয়ামী লীগ কর্মীরা শুনবেন?’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অনেকেই গত তিন নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। তাই এবার দলটির কর্মী-সমর্থকেরা ভোট উৎসবে অংশ নিচ্ছেন। তারা সৎ ও যোগ্য প্রার্থী এবং বিপদে যারা পাশে ছিলেন তাদেরকে ভোট দেবেন। তারা কোন চাঁদাবাজকে ভোট দেবেন না।’
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও পাবনা-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, ‘স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সংখ্যালঘু থেকে শুরু করে নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আওয়ামী লীগের নিরাপরাধ ভোটাররা এবার বিএনপির প্রার্থীদের ভোট দেবেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ-কর্মী সমর্থকেরা ভোটের মাঠে রয়েছেন এবং তারা ভোটও দিতে যাবেন।’
গত কয়েকদিনে কয়েকটি আসনে নির্বাচনী মাঠ পর্ববেক্ষণে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নির্বাচনী মাঠে অনেকটাই প্রকাশ্যে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা যার যার এলাকা নিয়ে নেতাকর্মীদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। সেখানে তারা গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়া এবং বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইছেন। যদিও তৃণমূল কেন্দ্রের কথা আমলে না নিয়ে সুবিধামতো প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিকালে আওয়ামী লীগের সাবেক ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমানের মালিকানাধীন এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এনামের স্ত্রী রৌশন আরা লাভলী ও শ্যালক সাইফুল ইসলামকে ঢাকা-১৯ (সাভার- আশুলিয়া) আসনের বিএনপি প্রার্থী দেওয়ান সালাউদ্দিন বাবুর পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
৫ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী-৪ আসনে বাগমারা উপজেলায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল বারীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোয় আওয়ামী লীগ নেতা মহিদুল ইসলাম (৪৮) ও তেলিপুকুর গাঙ্গোপাড়া বাজারে এনামুল হককে (২৭) মারধর করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় শান্ত (২২) নামের এক তরুণকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
শরীয়তপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম এনামুল হক শামীমের তার নির্দেশনায় আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধিদের একটি অংশ বিএনপি প্রার্থী শফিকুর রহমান কিরনের পক্ষে কাজ করছেন। আবার শামীমের আপন ছোট ভাই সিয়ামের লোকজন জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে ভোট করছেন বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা সামাজিক যোগাযোগ্ মাধ্যমে পোস্ট করেছেন।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরায় একাধিক নির্বাচনী আসনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনেকেরই দেখা মিলছে জামায়াত প্রার্থীর প্রচারণায়।
আবার ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজের পক্ষে প্রকাশ্য অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা কাজ করছেন।
অর্থাৎ সারাদেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মাঠে বিষয়টি এখন স্পষ্ট। ভোটে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও এই নির্বাচনে দলটির ফলাফলে যে, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে সেটিও বিশ্লেষক ও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দল বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের কথায় পরিষ্কার বার্তা বহন করছে।


