ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মাধ্যমে তৈরি করা ভুল তথ্যের লাগামহীন প্রসারে উদ্বেগ বাড়ছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন এই পরিস্থিতি সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ভোট গণনা বা ফলাফল ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তে যেকোনো সময় এআই-নির্ভর ছবি, ভিডিও এবং অডিও ক্লিপ বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তারা বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের চরিত্রহননের হাতিয়ার হিসেবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে, যা ভোটারদের মধ্যে আস্থার সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এই হুমকির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমানের নামে অনলাইনে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাকে একটি বিকাশ নম্বরের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা চাইতে দেখা যায়। তাদের মেয়ে জাইমা রহমানের নামে খোলা একটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি শেয়ার করা হয়, যা শুধুমাত্র ফেসবুকেই প্রায় ২০ লাখ মানুষ দেখেছেন। পরবর্তীতে ফ্যাক্ট-চেকাররা নিশ্চিত করেন যে, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
অন্য একটি ঘটনায়, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের নেতৃত্বে একটি মিছিলের ছবি ভাইরাল হয় এবং ফেসবুকে অন্তত ৫ হাজার বার শেয়ার করা হয়। পরবর্তীতে যাচাই করে দেখা যায়, সেই ছবিটিও ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি।
রাজনৈতিক বার্তা বিকৃতির এই প্রবণতা কেবল ছবি বা ভিডিওতেই সীমাবদ্ধ নেই। তারেক রহমানের নামে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, অন্য একটি দলের নেতার বক্তব্য সম্পাদনা করে তার কণ্ঠ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি একজন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতার কণ্ঠ নকল করে তৈরি একটি এআই অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাকে নির্বাচন বয়কটের ডাক দিতে শোনা যায়। পরে বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ওই অডিওটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া।
ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অপপ্রচারের এই মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ‘রিউমার স্ক্যানার’ জানিয়েছে, তারা গত জানুয়ারি মাসেই ৫৭৭টি মিথ্যা তথ্য শনাক্ত করেছে, যা তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ মাসিক রেকর্ড। এর মধ্যে প্রায় ৮১ শতাংশই ছিল রাজনীতি বিষয়ক। ওই মাসে সংস্থাটি ৪৫২টি ফ্যাক্ট-চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
সংস্থাটির মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন অফিসার কাওসার আহমেদ বলেন, ফেব্রুয়ারির প্রথম আট দিনেই তারা ১৭১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছেন, যার মধ্যে ১১৩টিই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি জানান, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নির্বাচনকেন্দ্রিক মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর হার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। চলতি মাসে তা আরও তীব্র হচ্ছে। ফলে বিগত নির্বাচনগুলোর তুলনায় বর্তমান নির্বাচন ফ্যাক্ট-চেকারদের জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোও একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে। বিএনপির নির্বাচন সমন্বয় কমিটির মুখপাত্র ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরেই তাদের দলের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে চরিত্রহননের প্রচারণা চালিয়ে আসছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা সাময়িকভাবে প্রভাব ফেললেও শেষ পর্যন্ত সত্য মানুষের সামনে চলে আসে। তিনি মনে করেন, এআই-চালিত ভুল তথ্য মোকাবিলায় কেবল নির্বাচন কমিশন নয়, রাজনৈতিক দলগুলোরও আরও দায়িত্বশীল ও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।
বিষয়টির আইনি দিকও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, এআই দিয়ে তৈরি হোক বা অন্য কোনো মাধ্যমে ভোটারদের বিভ্রান্ত করা, চরিত্রহনন এবং মিথ্যা বা প্রতারণামূলক তথ্য প্রচার করা নিষিদ্ধ। নির্বাচনী প্রচারণায় এআই-এর ব্যবহার সরাসরি নিষিদ্ধ না হলেও, আক্রমণাত্মক বা প্রতারণামূলক কন্টেন্ট তৈরি করা আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
ডিজিটাল অধিকার ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মূল সমস্যাটি স্বচ্ছতার অভাব। ‘ডিজিটালি রাইট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী টাইমস’কে বলেন, এআই বৈধ নির্বাচনী যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ভোটারদের দমানো, ভীতি প্রদর্শন বা অন্যের ছদ্মবেশ ধারণ করার ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
তিনি পরামর্শ দেন, এআই দিয়ে তৈরি প্রতিটি কন্টেন্টে স্পষ্ট লেবেল বা চিহ্ন থাকা উচিত যাতে ব্যবহারকারীরা সহজেই বুঝতে পারেন এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি। তবে তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই লেবেলিং নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর। কারণ, নির্বাচন কমিশনের পক্ষে প্রতিটি অনলাইন কন্টেন্টে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা সম্ভব নয়।
নির্বাচন কমিশন তাদের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছে। আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলের প্রধান সমন্বয়কারী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী জানান, ইউএনডিপি’র সহায়তায় একটি এআই-ভিত্তিক স্ক্যানিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। তবে সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে কমিশন কেবল সেই কন্টেন্টগুলোই বাছাই করে পর্যালোচনা করছে যা আইনশৃঙ্খলা বা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত।
ভোটের সময় ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এআই-চালিত ভুল তথ্য ও অপপ্রচার নির্বাচনী তথ্যের পরিবেশের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করছে। তাদের মতে, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, কনটেন্ট সঠিক লেবেল লাগানো এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই সংকট নিয়ন্ত্রণ করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়বে।


