বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভারতবিরোধী বক্তব্যের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। নির্বাচনী প্রচার জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি ভারতকে জড়িয়ে নানা ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যেসব দলের নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম, মূলত তারাই নির্দিষ্ট শ্রেণির ভোটারকে আকৃষ্ট করতে বা অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরাতে এ ধরনের কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে।
বিতর্কিত মন্তব্য ও উত্তেজনা
সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বক্তব্যে দাবি করেন, ১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার পরিকল্পনা। তার এই মন্তব্য ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। কারণ, এটি মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃত ইতিহাস এবং পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের ভূমিকার পরিপন্থী। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে সমর্থনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অতীতে সাধারণত ভারতবিরোধী রাজনীতি ‘ভারতীয় আধিপত্য’ বা ‘দাসত্ব’ কেন্দ্রিক থাকলেও, এবার সরাসরি ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানার মতো বক্তব্যকে নজিরবিহীন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক কৌশল
সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. আব্দুল হাই জানান, বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে ‘ভারত কার্ড’ ব্যবহার একটি পুরোনো প্রবণতা। একইভাবে ভারতেও মাঝেমধ্যে নির্বাচনী স্বার্থে ‘বাংলাদেশ কার্ড’ ব্যবহার করা হয়। তবে তিনি লক্ষ্য করেছেন, এবার অনেক পক্ষই বেশ সতর্ক। কারণ, অতিরিক্ত ভারত-বিদ্বেষী প্রচার সাধারণ শান্তিপ্রিয় ভোটার এবং ব্যবসায়ী সমাজকে ক্ষুব্ধ করতে পারে, যারা দুই দেশের স্থিতিশীল সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়।
অন্য একজন সাবেক কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেসব দলের সরকার গঠনের সম্ভাবনা থাকে, তারা সাধারণত ভারতের সাথে সম্পর্কের গভীরতার কথা মাথায় রেখে দায়িত্বশীল মন্তব্য করে। কারণ পানি বণ্টন, বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে দুই দেশ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।
সাম্প্রতিক ঘটনাক্রম
গত ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই রাজনীতিবিদ শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার চেষ্টার ঘটনায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে অপরাধী ভারতে পালিয়ে যেতে পারে। এর জেরে ১৪ ডিসেম্বর ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় এবং হাসনাত আবদুল্লাহর মন্তব্যের প্রতিবাদে ১৭ ডিসেম্বর দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করে ভারত সরকার। একই দিনে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন অভিমুখে একটি বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেওয়া হলেও পুলিশি বাধায় তা সফল হয়নি।
কারা খেলছেন ভারতবিরোধী কার্ড
পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমানে রাজনীতিতে দুটি প্রধান ধারা চলছে–একটি শেখ হাসিনাবিরোধী এবং অন্যটি ভারতবিরোধী। বড় দলগুলো মূলত সরকারের শাসনব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা করছে। অন্যদিকে ছোট দলগুলো জনসমর্থন পাওয়ার আশায় ভারতবিরোধী আবেগকে পুঁজি করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভূ-রাজনীতির বাস্তবতায় প্রতিবেশী পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাই যারা ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখে, তারা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না। ভারতের পক্ষ থেকেও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, কারণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা তাদের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়।
সামগ্রিক প্রভাব
ভারতবিরোধী বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু না হলেও, এবারের সরাসরি আক্রমণাত্মক ভাষা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে। তবে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক এতটাই মজবুত যে, সাময়িক এই রাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। সাধারণ ভোটারদের মূল মনোযোগ এখন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সুশাসনের দিকে। ফলে বিশেষ কিছু গোষ্ঠী ছাড়া সাধারণ মানুষের কাছে এই ভারতবিরোধী প্রচারণার আবেদন খুব একটা জোরালো হবে না বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন।


