বিশ্বকাপ মানে শুধু গোল ও ফলাফল নয়। প্রতিটি টুর্নামেন্টেই তৈরি হয় নিজস্ব কিছু অপ্রত্যাশিত তারকা ও স্মরণীয় পার্শ্বকাহিনী। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে মজার, অদ্ভুত ও হৃদয়স্পর্শী মুহূর্তগুলো দ্রুত বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৬ সালের টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ চলছে। ভক্তরা জার্মান পর্যটকের ওয়াফল হাউসের প্রতি ভালোবাসা থেকে শুরু করে কানসাসের কলেজ শহরের আলজেরিয়াকে আপন করে নেওয়ার গল্প লুফে নিয়েছে। ইন্টারনেটে আলোড়ন তোলা কয়েকটি ভাইরাল মুহূর্ত এখানে তুলে ধরা হলো।
জার্মানির প্রিয় আমেরিকান রোড ট্রিপ
জার্মান ফুটবল অনুরাগী ফ্রেডি কোনো ম্যাচ না খেলেও বিশ্বকাপের প্রথম উদীয়মান তারকা হয়ে উঠেছেন। ম্যাচ দেখতে যাওয়ার পথে তিনি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ভ্রমণ করছেন। সামাজিক মাধ্যমে তার প্রতিটি গন্তব্যের বিবরণ লাখ লাখ অনুসারীকে আকর্ষণ করেছে। আমেরিকার দৈনন্দিন জীবন নিয়ে ফ্রেডির উচ্ছ্বাস এখন বিনোদনের খোরাক। তিনি টাকো বেলকে ‘পবিত্র ভূমি’ আখ্যা দিয়েছেন। গভীর রাতে ওয়াফল হাউসে গিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। বুক-ইজ দেখে তিনি হতবাক। ওয়ালমার্ট, ওয়েন্ডিস ও চিলিস নিয়ে উচ্ছ্বসিত বার্তা পোস্ট করেছেন ফ্রেডি। আটলান্টার সবুজ প্রকৃতি ও কোকা-কোলা ফ্রিস্টাইল মেশিন দেখে তিনি মুগ্ধ। একজন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, ‘লোকটা দারুণ সময় কাটাচ্ছে ও তা উপভোগ করছে।’
কানসাসের লরেন্স আলজেরিয়াকে দত্তক নিয়েছে
আলজেরিয়া কানসাসের লরেন্সকে বিশ্বকাপ ঘাঁটি হিসেবে বেছে নেওয়ায় শহরটি দলটিকে দারুণ উৎসাহে গ্রহণ করেছে। মধ্য-পশ্চিমের এই কলেজ শহরটি টুর্নামেন্টের অন্যতম আনন্দদায়ক গল্পে পরিণত হয়েছে। রক চক পার্কের উন্মুক্ত অনুশীলনে শত শত সমর্থক উপস্থিত ছিলেন। শিশুরা মুখে আলজেরীয় রং মেখেছিল। সমর্থকেরা সবুজ, সাদা ও লাল পতাকায় নিজেদের আবৃত করেন। কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যান্ড ‘দ্য মার্চিং জেহকস’ আলজেরিয়ার জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে। শহরবাসী ও অতিথিদের আন্তরিক স্নেহের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। বাসিন্দারা লরেন্সকে বেছে নেওয়ার জন্য আলজেরিয়াকে ধন্যবাদ জানান। কানসাসের এক তরুণ সাংবাদিকদের বলেন, ‘সমর্থকদের মাঝে সময় কাটানোর পর নিজেকে আলজেরীয় মনে হচ্ছে।’
মেক্সিকোর সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান বন্ধুত্ব
দক্ষিণ কোরিয়া ও মেক্সিকোর সমর্থকদের বন্ধুত্ব ফুটবলের এক ব্যতিক্রমী জোট। ২০২৬ বিশ্বকাপ এটিকে আবারও আলোচনায় এনেছে। মেক্সিকোর আয়োজক শহরগুলোর ভিডিওতে দেখা যায়, খেলা শুরুর আগেই উভয় দেশের সমর্থকেরা একসঙ্গে খাবার, গান ও উদযাপনে মেতে উঠেছেন। এই বন্ধনের সূত্রপাত ২০১৮ বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে দক্ষিণ কোরিয়ার জয়ের মাধ্যমে। সেই জয় মেক্সিকোকে নকআউট পর্বে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল। আট বছর পরেও মেক্সিকোর সমর্থকেরা তা ভোলেননি। তাঁরা রাস্তায় ‘কোরিয়া, কোরিয়া, কোরিয়া’ বলে স্লোগান দিচ্ছেন। আরেকটি ভাইরাল ক্লিপে দুই দেশের সমর্থকদের একসঙ্গে সাইয়ের ‘গ্যাংনাম স্টাইল’ গানটি গাইতে দেখা যায়।
তিনটি লাল কার্ড ও এক অবোধ্য রেফারি
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মেক্সিকোর উদ্বোধনী ম্যাচটি ছিল বিশৃঙ্খল। তিনটি লাল কার্ডের কারণে অনলাইনে রসিকতা শুরু হয়, বিশ্বকাপ গ্রুপ পর্ব এড়িয়ে সরাসরি নকআউটের নাটকে চলে গেছে। ব্রাজিলিয়ান রেফারি উইল্টন সাম্পাইও ভিএআর সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে ফিফার নতুন স্টেডিয়াম ঘোষণা ব্যবস্থা ব্যবহার করেন। দর্শকেরা তার কথা বুঝতে পারছিলেন না। ফলে প্যারোডি সাবটাইটেল, ভুয়া অনুবাদ ও প্রতিক্রিয়া ভিডিওর বন্যা বয়ে যায়। কিছু সমর্থক মজা করে বলেন, এই ব্যাখ্যা সিদ্ধান্তটিকে আরও বিভ্রান্তিকর করেছে।
আর্লিং হালান্ড হকি ভক্ত
নরওয়েজীয় স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের আগে আইস হকি দেখে সময় কাটিয়েছেন। ১৯৯৮ সালের পর দেশের প্রথম বিশ্বকাপ অংশগ্রহণের আগে তিনি সতীর্থদের সঙ্গে উত্তর ক্যারোলিনার র্যালিতে এনএইচএল স্ট্যানলি কাপ ফাইনালের পঞ্চম ম্যাচ দেখতে যান। বিশাল পর্দায় হালান্ডকে ক্যারোলিনা হারিকেনসের র্যালি টাওয়েল নাড়তে দেখে মুহূর্তেই ভিডিওটি ভাইরাল হয়। ফুটবলের ভয়ঙ্কর ফরোয়ার্ডকে উত্তেজিত হকি ভক্তের মতো দেখতে পেয়ে সোশ্যাল মিডিয়া আনন্দিত। প্রিমিয়ার লিগের ডিফেন্ডারদের ত্রাস হালান্ডকে তখন বন্ধুদের সঙ্গে রাত কাটানো এক সাধারণ পর্যটকের মতোই লাগছিল।
রেফারির কল্পবিজ্ঞান ক্যামেরা
ফিফার রেফারির নতুন ক্যামেরা ইন্টারনেটের মনোযোগ কেড়েছে। উদ্বোধনী ম্যাচে রেফারি সাম্পাইওর ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও যোগাযোগ ডিভাইসের সংগ্রহ তাঁকে প্রথম মিম তারকায় পরিণত করে। ভক্তরা এই ব্রাজিলীয় কর্মকর্তাকে সাইবর্গ, ড্রোন চালক ও ভিডিও গেমের চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সম্পাদিত ছবিতে তার সরঞ্জামের পরিমাণ অতিরঞ্জিত করা হয়। অনেকে মজা করে বলেন, তাকে রেফারির চেয়ে একা একটি টেলিভিশন প্রোডাকশন দলের মতো লাগছিল।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রতিক্রিয়া
মেক্সিকো সিটির জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। অনেকে শাকিরা, বার্না বয়, জে বালভিন ও মানার পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেছেন। অন্যরা পূর্ববর্তী আয়োজনের জাঁকমকের সঙ্গে তুলনা করে প্রশ্ন তুলেছেন। ‘দ্য ন্যাশনাল’-এর সঙ্গীত সমালোচক সাঈদ সাঈদ অনুষ্ঠানটিকে ‘উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত… সম্ভবত একটু বেশিই প্রাণবন্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এটি ‘একটু অপূর্ণাঙ্গ’ মনে হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া মিম ও সমালোচনা পোস্টে ভরে যায়।
মার্লিন হাঁস মেক্সিকোর অনানুষ্ঠানিক মাসকট
মেক্সিকো সিটির দুই বছর বয়সী হাঁস মার্লিন মেক্সিকোর শার্ট ও ছোট জুতো পরে হেঁটে যাওয়ার ভিডিওর মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মেক্সিকোর জয়ের পর সমর্থকেরা মার্লিনকে আপন করে নেয়। পাখিটির ভিডিও ক্লিপ অনলাইনে লাখ লাখ ভিউ পেয়েছে। ২০১০ বিশ্বকাপের পল দ্য অক্টোপাসের সঙ্গে এর তুলনা করা হচ্ছে। মালিক কার্লা গোমেজের সঙ্গে সাধারণ ভ্রমণ থেকে হাঁসটি টুর্নামেন্টের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছে।
স্কটল্যান্ড সমর্থকদের ফেনওয়ে পার্ক দখল
স্কটল্যান্ডের সমর্থকেরা ফুটবল দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে বেসবল খেলায় সবার নজর কেড়েছেন। হাইতির বিরুদ্ধে জয়ের পর হাজার হাজার সমর্থক বস্টনের ফেনওয়ে পার্কে রেড সক্সের খেলা দেখতে যান। স্টেডিয়াম জুড়ে ব্যাগপাইপের সুর প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। গ্যালারিতে মিডফিল্ডার জন ম্যাকগিনের প্রতি উৎসর্গ করে স্লোগান ওঠে। হতবাক বেসবল ভক্তরা স্কটিশ ফুটবল সংস্কৃতিতে মেতে ওঠেন। স্থানীয় ধারাভাষ্যকাররা মজা করে বলেন, তারা চান না সমর্থকেরা চলে যাক।
চলন্ত সিঁড়ি যখন ভাইকিং জাহাজ
বস্টনে নরওয়ের সমর্থকেরা একটি দীর্ঘ চলন্ত সিঁড়িকে কাল্পনিক ভাইকিং জাহাজে রূপান্তরিত করেন। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গান গাইতে গাইতে সমর্থকেরা ওপরের দিকে যাওয়ার সময় নৌকা বাইচ দেওয়ার ভান করছিলেন। ভিডিওটি দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। স্বতঃস্ফূর্ত এই মুহূর্তটি বিশ্বকাপের লোককথার অংশ হয়ে উঠেছে।
জাপানি ভক্তদের টেক্সাস আবিষ্কার
জাপানি সমর্থকেরা টেক্সাস শহরের প্রতি মুগ্ধ হয়ে পড়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের ভিডিওগুলো বিখ্যাত বারবিকিউ রেস্তোরাঁ, বিশাল স্টেক, ওয়ালমার্ট, স্কুল বাস ও মেকানিক্যাল বুলের অভিজ্ঞতায় ভরপুর। একজন সমর্থক টেক্সাসকে ‘সবকিছুই বিশাল’ এমন জায়গা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যজন টেক্সাস রোডহাউসের রুটিকে ‘অবিশ্বাস্যরকম সুস্বাদু’ বলে ভাইরালে রূপ দেন। রেস্তোরাঁয় বিনামূল্যে চিপস ও সালসা পেয়ে অনেকে বিস্মিত। জাপানি ভক্তরা টেক্সানদের ‘ওইশিই’ (সুস্বাদু) শব্দের সঙ্গে পরিচয় করাচ্ছেন। স্থানীয়রা তাঁদের বারবিকিউ প্ল্যাটার ও ইন-এন-আউট অর্ডার করতে সাহায্য করছেন।
স্টেডিয়াম পরিষ্কারে জাপানিদের সঙ্গে এনএফএল তারকা
জাপানি সমর্থকেরা স্টেডিয়ামের আবর্জনা পরিষ্কারের জন্য বিখ্যাত। ২০২৬ বিশ্বকাপে তাদের সঙ্গে যোগ দেন এনএফএল তারকা জেমিস উইনস্টন। ডালাসে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে জাপানের ২-২ ড্রয়ের পর নিউ ইয়র্ক জায়ান্টসের এই কোয়ার্টারব্যাক গ্যালারির আবর্জনা কুড়ান। ফক্স স্পোর্টসের সংবাদদাতা হিসেবে কর্মরত উইনস্টন নিজের নাম ও নম্বর লেখা জাপানি জার্সি পরে নীল আবর্জনার ব্যাগ বহন করেন। উইনস্টন বলেন, ভক্তদের শ্রদ্ধাবোধ তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। বর্জ্য আলাদা করার পদ্ধতি দেখে তিনি মুগ্ধ হন।
কেপ ভার্দের গোলরক্ষক রাতারাতি তারকা
বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে এসেছিল অপরিচিত দল হিসেবে। স্পেনের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচের পর ভোজিনহাকে সবাই চিনেছে। অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষক স্পেনের বিপক্ষে একের পর এক সেভ করে দলকে গোলশূন্য ড্র উপহার দেন। তার সেভের ক্লিপ দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। স্পেনের দলে লামিন ইয়ামাল ও পেদ্রির মতো তারকা থাকলেও ভোজিনহা হার মানেননি। শেষ বাঁশি বাজার আগেই তিনি টুর্নামেন্টের অন্যতম আন্ডারডগ নায়কে পরিণত হন।
ডালাসে ডাচ ভক্তদের কমলা প্যারেড
জাপানের বিপক্ষে নেদারল্যান্ডসের উদ্বোধনী ম্যাচের আগে হাজার হাজার ডাচ সমর্থক উজ্জ্বল কমলা রঙের পোশাক পরে ডালাসের রাস্তায় নামেন। ভক্তদের এই মিছিলের ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। সমর্থকেরা গান গেয়ে, নেচে শহরটিকে একটি চলমান কমলা প্যারেডে পরিণত করেন। টেক্সাসবাসী ফুটবলের এই পরিচিত ভক্ত সংস্কৃতির এক রঙিন দৃশ্য উপভোগ করেন।
নরওয়ের ঐতিহ্যবাহী ভাইকিং রো
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করার পর মার্টিন ওডেগার্ডের নেতৃত্বে নরওয়ে দল ও সমর্থকেরা ঐতিহ্যবাহী ‘ভাইকিং রো’ পালন করছে। বিশ্বকাপে ফিরতে নরওয়েকে ২৮ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সমর্থকেরা গ্যালারিতে বসে একসঙ্গে সামনে-পেছনে নড়ে ‘রো’ (দাঁড়টানা) বলে স্লোগান দেন। যেন তারা গ্যালারির মধ্য দিয়ে লম্বা জাহাজ ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন। সেনেগালের বিপক্ষে জয়ের পর খেলোয়াড়েরাও মাঠে এতে যোগ দেন। এটি টুর্নামেন্টের অন্যতম স্মরণীয় সমর্থক প্রথায় পরিণত হয়েছে।


