বর্ষায় পানিতে ডুবে থাকা বিল ও কৃষিজমিতে জন্মানো শাপলা এখন বরিশালের আগৈলঝাড়ার বহু পরিবারের আয়ের উৎস। কৃষিকাজ কমে যাওয়ার এ সময়ে বিনা পুঁজিতে শাপলা সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন উপজেলার কয়েক শ মানুষ।
ভোরে নৌকা নিয়ে বিলে নামেন সংগ্রহকারীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা শাপলা তুলে স্থানীয় পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। পাইকাররা ভ্যানে করে বিভিন্ন হাট-বাজার ও গ্রামে নিয়ে তা বিক্রি করেন।
আগৈলঝাড়ার চেংগুটিয়া-চৌদ্দমেদা বিলসহ বিভিন্ন বিল ও জলাবদ্ধ কৃষিজমিতে এখন শাপলা সংগ্রহের ব্যস্ততা। রাজিহার, গৈলা, বাকাল, বাগধা ও রতপুর ইউনিয়নের মানুষ এ কাজে যুক্ত হয়েছেন।
শাপলা সংগ্রহকারী মো. কালাম হাওলাদার বলেন, ‘বর্ষায় কৃষিকাজ তেমন থাকে না। তাই ভোরে নৌকা নিয়ে বিলে যাই। দিনে ২০০ থেকে ৪০০ মুঠা শাপলা সংগ্রহ করতে পারি।’
পাইকাররা প্রতি মুঠা শাপলা প্রায় ৫ টাকা দরে কেনেন। পরে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে ১০ টাকা দরে বিক্রি করেন।
পাইকার বনজ মণ্ডল বলেন, ‘প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ মুঠা শাপলা বিক্রি করি। সব খরচ বাদ দিয়ে ভালোই আয় থাকে।’
স্থানীয়দের মতে, একজন সংগ্রহকারী প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ মুঠা শাপলা তুলতে পারেন। ভালো দিনে আয় হয় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। পাইকারদের দৈনিক বিক্রি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বা তারও বেশি।

শাপলা সংগ্রহকারী রহমান বলেন, ‘বছরের প্রায় চার মাস এ কাজ করি। এ সময় জমিতে কাজ থাকে না। শাপলা বিক্রির টাকা দিয়ে সংসার চালাই। কোনো পুঁজি লাগে না। তাই বর্ষায় এটি আমাদের বড় ভরসা।’
শাপলা স্থানীয়ভাবে সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর ডাঁটা দিয়ে তৈরি তরকারির চাহিদা গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি শহরেও বাড়ছে। ফলে বিনা খরচে পাওয়া শাপলা এখন স্থানীয় বাজারে অর্থকরী পণ্যে পরিণত হয়েছে।
আষাঢ় থেকে ভাদ্র পর্যন্ত শাপলার মৌসুম। বর্ষার পানিতে ডুবে থাকা জমি, খাল-বিল, পুকুর ও ডোবায় প্রাকৃতিকভাবে শাপলা জন্মে। এতে কৃষকের কোনো বিনিয়োগ লাগে না।
আগৈলঝাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুনীতি কুমার সাহা বলেন, ‘শাপলা প্রচলিত কৃষিপণ্য নয়। এটি প্রাকৃতিকভাবে কৃষিজমি, পুকুর, ডোবা ও জলাশয়ে জন্মে। কৃষি বিভাগ শাপলা সংরক্ষণে পরামর্শ দিয়ে থাকে।’
বরিশাল বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘যথাযথ সংরক্ষণ ও বিদেশে রপ্তানি করা গেলে শাপলা থেকে প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘শাপলা সংগ্রহে পুঁজি লাগে না। তাই বিভিন্ন বয়সের কৃষক বর্ষায় এ পেশায় যুক্ত হয়েছেন। প্রতি ১০০ গ্রাম শাপলা লতায় ৩১ গ্রাম শর্করা, ৩ গ্রাম প্রোটিন ও ৭৬ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম রয়েছে।’
বর্ষায় কৃষিজমি পানিতে ডুবে থাকায় আগৈলঝাড়ায় কৃষিকাজ কমে যায়। সেই পানিই এখন অনেক পরিবারের আয়ের উৎস। শাপলা সংগ্রহ, পাইকারি ও খুচরা বিক্রিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে মৌসুমি আয়ের সুযোগ। জাতীয় ফুল শাপলা এখন বহু পরিবারের জীবিকার অবলম্বন।


