দীর্ঘদিনের ভেঙে পড়া সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাবিত ঋণ বিতরণ এবং একের পর এক নিয়ন্ত্রক ছাড়ে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বাজার শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে এবং মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
এই ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যেই অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিন নীতিগত অনিশ্চয়তা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তার সতর্কবার্তা, আকস্মিক ও পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত এখন আর্থিক স্থিতিশীলতার বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতে হলে নেতৃত্ব নিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই, ঋণের প্রকৃত মালিকানা প্রকাশ, ব্যাংকগুলোতে শর্তসাপেক্ষ পুনঃমূলধন যোগান এবং দ্রুত মন্দ ঋণ নিষ্পত্তির মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।
আরেফিনের মতে, সংস্কারের মূল কথা খুবই সরল কিন্তু দীর্ঘদিন উপেক্ষিত। “ব্যাংকিং সংস্কারের মূল স্লোগান হওয়া উচিত দুই শব্দে – গভর্ন্যান্স ফার্স্ট,” বলেন তিনি।
তাঁর ভাষায়, অস্বাভাবিক উচ্চ খেলাপি ঋণ, বারবার ঋণ জালিয়াতি এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট ঋণ বিতরণ ব্যাংকের প্রতি জনবিশ্বাসকে বিপজ্জনকভাবে নিচে নামিয়ে দিয়েছে।
শীর্ষ পর্যায় থেকেই সংস্কার
এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে সংস্কার শুরু করতে হবে শীর্ষ পর্যায় থেকে – এমনটাই মনে করেন আরেফিন। তিনি ব্যাংক পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের জন্য শক্তিশালী ও বাস্তবসম্মত ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ কাঠামো কঠোরভাবে প্রয়োগের আহ্বান জানান। তাঁর মতে, নেতৃত্বের মান ঠিক না হলে কোনো গভীর সংস্কারই টেকসই হবে না।
এর পাশাপাশি তিনি ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগীর তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশের ওপর জোর দেন, যাতে গোপন ঝুঁকি নতুন করে আর ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে জমা হতে না পারে।
তিনি পরিচালকদের মেয়াদ, আন্তঃব্যাংক বিনিয়োগের সীমা এবং স্বতন্ত্র পরিচালকদের কার্যকারিতা নতুন করে পর্যালোচনার কথাও বলেন। এমনকি ‘পরিবার’ শব্দটির আইনি সংজ্ঞা আরও কঠোর করা দরকার বলে উল্লেখ করেন, যাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার বিধিনিষেধ কার্যকর হয়। তাঁর মতে, পরিবার বা সংশ্লিষ্টতার সংজ্ঞা ঢিলেঢালা থাকলে প্রকৃত সম্পর্ক গোপন রেখে সহজেই নিজেদের লোককে ঋণ দেওয়া বা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করার মতো সুযোগ তৈরি হয়।
তার মতে, ব্যাংক কোম্পানি আইনকে ব্যাসেল কোর প্রিন্সিপলের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে, যাতে তদারকি ব্যবস্থা ঝুঁকিভিত্তিক হয়, শুধু প্রতিক্রিয়াশীল না থাকে।
আরেফিন বলেন, দেশে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির পর প্রায়ই জনতুষ্টিমূলক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যা দুর্বল ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। এতে শেষ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অর্থাৎ, কোনো কেলেঙ্কারির পর হঠাৎ কঠোর কিন্তু অন্ধভাবে নেওয়া পদক্ষেপের মাধ্যমে সব ব্যাংককে একই নিয়মে বেঁধে ফেলা হয়। এতে যারা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় আছে তারাও অযথা চাপের মধ্যে পড়ে এবং সামগ্রিকভাবে খাতের কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে যায়।
মূলধন শৃঙ্খলা জরুরি
সুশাসনের ঘাটতির পাশাপাশি তিনি ব্যাংক খাতের বিভিন্ন অংশে মূলধন বাফার – অর্থাৎ সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দেওয়ার জন্য রাখা অতিরিক্ত নিরাপত্তা মূলধন – ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার বিষয়েও সতর্ক করেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই সুরক্ষা স্তর দুর্বল হয়ে পড়ায় আগে আড়ালে থাকা আর্থিক দুর্বলতা ও সম্ভাব্য দেউলিয়াত্বের ঝুঁকি এখন বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। ফলে ক্ষতি সামাল দিতে ব্যাংকগুলোকে ঘন ঘন নতুন মূলধন জোগাড় বা পুনঃমূলধনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা পুরো খাতের স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি একটি স্বাধীন সম্পদ মান পর্যালোচনা শেষ করে নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক পুনঃমূলধন পরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শর্তহীন সহায়তা দেওয়া উচিত নয়।
তার মতে, মূলধন সহায়তা কেবল সেই ব্যাংকগুলোকে দেওয়া উচিত, যারা ঋণ অবলোপন, সুশাসনকেন্দ্রিক সংস্কার এবং মন্দ ঋণ আদায়ের কঠোর লক্ষ্য মানতে রাজি হবে।
যেসব ব্যাংক এতে রাজি হবে না, তাদের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেজোল্যুশন টুল ব্যবহার করা উচিত। এর মধ্যে রয়েছে ব্রিজ ব্যাংক গঠন, শক্তিশালী ব্যাংকের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকের সম্পদ ও দায় গ্রহণ এবং প্রয়োজনে ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন।
তিনি বলেন, এসব নীতিগত কাঠামো অনেকটাই আছে; এখন আসল চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন।
একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর গভীর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। ব্যাংকগুলোতে বছর বছর মূলধন যোগান দিতে গিয়ে সরকারের ওপর আসা রাজস্বের চাপ কমানো ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক একীভূতকরণ অনিবার্য হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন তিনি।
তবে তিনি সতর্ক করেন, জবাবদিহি, পেশাদার পর্ষদ এবং কঠোর ঋণ আদায়ের বাধ্যবাধকতা ছাড়া একীভূতকরণ ফল দেবে না।
নীতিগত অসামঞ্জস্য বন্ধ করতে হবে
আরেফিনের মতে, নীতিগত অসামঞ্জস্য এখন আরেকটি বড় দুর্বলতা। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি এবং তাঁর ভাষায় ‘মিশ্র নীতিগত সংকেত’ মুদ্রানীতির ওপর আস্থা দুর্বল করছে।
তিনি উদাহরণ দেন, যেখানে সংকোচনমূলক নীতির কথা বলা হলেও একই সময়ে তারল্য সহায়তা অব্যাহত রাখা হয়েছে বা সুদের হারের করিডর ঘন ঘন পরিবর্তন করা হয়েছে।
এ ধরনের পদক্ষেপ বাজারকে বিভ্রান্ত করে এবং নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে বলে তিনি সতর্ক করেন। তাই তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতার ওপর জোর দেন এবং একটি স্পষ্ট মূল্যস্ফীতি রোডম্যাপের আহ্বান জানান।
তার মতে, সুদের হার করিডরকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে, যাতে কোনো বাহ্যিক বা কৃত্রিম চাপ না থাকে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও এবিবির মধ্যে ‘ইগো’ বা অহংবর্জিত সংলাপ চালু রাখার কথাও বলেন তিনি।
সম্প্রতি মাত্র ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি সতর্ক মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, এই সুবিধা বিশেষ পরিস্থিতিতে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু বারবার নিয়ন্ত্রক সহনশীলতা ঋণ শৃঙ্খলাকে দুর্বল করে।
“মূলধনের একটি বাস্তব খরচ আছে,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঋণগ্রহীতার শক্ত প্রতিশ্রুতি ও নিজস্ব অংশগ্রহণ ছাড়া ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ালে নৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ ধরনের নীতিগত সংকেত বাজারের আচরণ বদলে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ক্ষতি করতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তাই তিনি বাজারভিত্তিক শৃঙ্খলা ও শক্তিশালী জবাবদিহির ওপর জোর দেন।
তিনি অতীতে প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে ব্যাংকগুলো থেকে বড় অঙ্কের অনুদান সংগ্রহের প্রথার বিরোধিতা করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই প্রথা থেকে বের হওয়া গেছে জানিয়ে বলেন, “এই সংস্কৃতি আর ফিরে আসতে দেওয়া উচিত নয়”।
আগামী দিনের দিকে তাকিয়ে আরেফিন বলেন, আস্থা ফেরাতে হলে আইন, নীতি ও তদারকি ব্যবস্থাগুলোকে শুধু কাগজে না রেখে বাস্তবে কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। দ্রুত অর্থঋণ আদালত প্রক্রিয়া, শক্তিশালী ক্রেডিট ব্যুরো, অর্থপাচারবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং ব্যাংকের স্বাস্থ্য সূচকের স্বচ্ছ প্রকাশ – এসবই এখন জরুরি।
সবশেষে তার স্পষ্ট বার্তা: ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে পূর্বানুমানযোগ্য হতে হবে। বাজারকে চমকে দেওয়া বন্ধ হলেই টেকসইভাবে আস্থা ও বিনিয়োগ ফিরে আসবে।


