নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় ইউনিসেফ দারিদ্র্য বৃদ্ধির যে শঙ্কার কথা জানিয়েছে, সেটি আসলে কতটা তীব্র তা বোঝা যায় নিম্ন আয়ের মানুষদের কাছে গেলেই
ঢাকায় গুলশানে আলো ঝলমলে জীবনের নিচেই অন্ধকারের মতো কড়াইল বস্তির জীবন। সীমিত আয়ের মানুষদের মাথা গোঁজার ঠাঁই এখানে। রান্না এখানে কেবল ক্ষুধা মেটানোর চেষ্টা, রসনা বিলাস নয়।
এরশাদ বাজারসংলগ্ন একটি গলিতে ৬৬ বছর বয়সী রহিমা বেগমকে মুরগির গিলা-কলিজা পরিষ্কার করতে দেখা যায়। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার সংসারে এক ছেলে, তার ছেলে-মেয়ে আর সদ্য জন্ম নেওয়া একটি নাতি আছে। বউ অসুস্থ, ছেলে ঢাকার বাইরে থাকে। এই বয়সেও আমাকে বাজার করতে হয়। আজকে ফার্মের মুরগির দাম ২০০ টাকা। এত টাকা খরচ করতে পারিনি। তাই মুরগি না কিনে গিলা-কলিজা নিয়ে এসেছি, এটুকু দিয়েই রান্না হবে।’
চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ভুগতে থাকা দেশে স্বস্তির কোনো আভাসও নেই। এর মধ্যে আবার চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আর হরমুজ প্রণালি বন্ধ। ইউনিসেফ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে নিত্যপণ্যের বাড়তি দর ১২ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নামিয়ে দেবে।
রিকশাচালক মো. উসমান বলেন, ‘কত টাকাই-বা আয় হয়? আজ শুক্রবার ছেলে মাছ-মাংস খেতে চাইল। কিন্তু যে দাম বেড়েছে, গোটা মাছ কেনা সম্ভব না। রুই মাছের অর্ধেক কিনতেই প্রায় ৪০০ টাকা লেগেছে। এরপর চাল, মসলা কিনতে হবে। কিন্তু রিকশাওয়ালা অনেক, যাত্রী কমে গেছে, ভাড়াও আগের মতো পাই না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘ইমপ্লিকেশনস অব হাই ফুড ইনফ্লেশন অন ফুড সিকিউরিটি ইন আরবান স্লাম হাউজহোন্ড ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় ৭০৪টি বস্তি পরিবারের জীবনের বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। এতে দেখা যায়, উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির সময়ে আগে খাদ্যনিরাপদ থাকা পরিবারের ৪৬ শতাংশ মৃদু, ২১ শতাংশ মাঝারি এবং ১২ শতাংশ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তায় পড়ে।
অনেক পরিবার কম পুষ্টিকর খাবার খায়, তারা ঋণ করে, এমনকি সন্তানকে স্কুল থেকে সরিয়ে আনে।
কড়াইলে মানুষের দুশ্চিন্তা কেবল খাদ্যের বাড়তি দর নয়, জ্বালানির বাড়তি দরও। গ্যাসে না, কাঠের লাকড়িতে রান্না করে অনেকে। প্রতি কেজি কাঠ বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায়। স্থানীয়দের হিসাবে, একটি পরিবারের প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ কেজি কাঠ লাগে।
কাঠ বিক্রেতা রফিক টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আগের চেয়ে এখন লাকড়ি বেশি বিক্রি হয়। গ্যাস থাকে না, মানুষ বাধ্য হয়ে কাঠ কিনছে।’
অটোরিকশাচালক মানিক বলেন, ‘আগে মাসে হাজার টাকা গ্যাস বিল দিতাম, কিন্তু গ্যাস পেতাম না। এখন বাড়ির মালিক গ্যাসের লাইনই কেটে দিয়েছেন। তাই লাকড়ি দিয়েই রান্না করতে হচ্ছে।’
বিকেল ৫টার দিকে আট বছরের জুলেখার দাদিকে খালি চুলার পাশে বসে থাকতে দেখা যায়। সকালে রান্না হয়নি। সারাদিন লাকড়ি জ্বালিয়ে রাখার সামর্থ্যও নেই।
কড়াইলের সরু গলি থেকে জুলেখা প্রতিদিন বনানীর উঁচু ভবন আর ব্যক্তিগত গাড়িতে স্কুলে যাওয়া শিশুদের দেখে। অথচ দারিদ্র্যের কারণে জাগো ফাউন্ডেশনের স্কুলে তার নিজের উপস্থিতিও অনিয়মিত।
বাজারে বন্যার আঘাত
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ যখন পানির নিচে, তখন কৃষি, মৎস্য আর প্রাণিসম্পদের যে ব্যাপক ক্ষতি, সেটিও এবার বাজারে হেনেছে নতুন আঘাত।
মাছ, সবজি, ডিম, মুরগি থেকে শুরু করে কাঁচামরিচ পর্যন্ত কয়েক দিনের ব্যবধানে অনেকটাই বেড়ে গেছে।
শুক্রবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মেরুল বাড্ডা, উত্তর বাড্ডা ও মালিবাগ কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতাদের নাভিশ্বাস।
বিক্রেতারা বলছেন, টানা বৃষ্টি আর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় মাছের ঘের ও সবজির খেত তলিয়ে যাওয়ায় সরবরাহ কমেছে, যার প্রভাব পড়েছে দামে।
মাছের দাম এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বাড়তি। তাও গত সপ্তাহে যে রুই মাছের কেজি ছিল ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা, এখন তার দাম ৪০০ থেকে ৪৫০। তেলাপিয়া, পাঙাশ থেকে শুরু করে সব ধরনের মাছের দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
গত সপ্তাহের তুলনায় তেলাপিয়া ও পাঙাশের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়ে যথাক্রমে ২৪০-২৬০ টাকা এবং ২২০-২৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। চাষের পাঙ্গাশের এমন দাম এর আগে কখনও দেখেনি ক্রেতারা।
ঘেরের চিংড়ির দাম কেজিপ্রতি ১০০ টাকা বেড়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন বিক্রেতারা। মাঝারি আকারের চাষের পাবদার দাম ছুঁয়েছে ৪৫০ টাকায়।
মেরুল বাড্ডার মাছ বিক্রেতা মোহাম্মদ সুমন বলেন, ‘মোকামে মাছ কম উঠছে। আড়তে মাছ না থাকলে আমাদের বেশি দামে কিনতে হয়। খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়াটাই স্বাভাবিক।’
কারওয়ান বাজারের পাইকারি মাছ ব্যবসায়ী সাব্বির জানান, চিংড়ি, রূপচাঁদা, শোল ও বড় রুইয়ের দাম বরাবরই বেশি থাকে, কারণ এগুলো বেশি আয়ের মানুষ কেনেন।
মেরুল বাড্ডা আড়তে গিয়ে পাওয়া গেল ক্রেতা সূর্য আলমকে, যিনি মনে করছেন, বৃষ্টি ও বন্যাকে ব্যবহার করে দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়েছে।
মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজারের ক্রেতা সবুজ ইসলাম বলেন, ‘আমাদের মতো সাধারণ মানুষের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
গত সপ্তাহে যে বেগুন ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেটির দাম এখন ১০০ থেকে ১২০ টাকা। ৬০ থেকে ৭০ টাকার করলার দাম হয়ে গেছে ৯০ থেকে ১০০ টাকা।
ঝিঙা, চিচিঙ্গা ও ধুন্দল, বরবটির দামও বেড়েছে একই হারে। গত সপ্তাহে যে লাউ পাওয়া গেছে ৬০ টাকায় সেটির দাম এখন ৮০ থেকে ৯০। কাঁচামরিচের দাম কেজিতে বেড়েছে ৪০ থেকে ৬০ টাকা।
চট্টগ্রাম থেকে রাজধানীতে সবজি নিয়ে আসা ট্রাকের মালিক রহিম সাগর বলেন, বন্যার কারণে সরবরাহ কম।
চট্টগ্রামের সবজি চাষি ও ব্যবসায়ী খালিদ রহমান বলেন, ‘আমি ৩০ একর জমিতে বেগুন ও আলুর চাষ করেছিলাম। বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছি। শুধু আমি নই, অনেক কৃষকই একই পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন।’
ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম বেড়েছে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা, ডিমের ডজন গত সপ্তাহে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা থাকলেও এখন ছাড়িয়েছে ১৪০। সুপার শপে ১৪৪ টাকা ডজন দরে ডিম বিক্রি হতে দেখা গেছে, দুই সপ্তাহ আগেও যা ছিল ১২০ টাকা।


