জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে কর্মজীবী নারীদের জন্য দিনে পাঁচ ঘণ্টা কাজ করে আট ঘণ্টার বেতন দেবে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন দলটির আমির শফিকুর রহমান। ‘মায়েদের সম্মান’ জানানোর উপায় হিসাবে এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে জামায়াতের এই পরিকল্পনা। আপাতদৃষ্টিতে নারীর জন্য এই পরিকল্পনা উদার মনে হতে পারে। কিন্তু গভীরভাবে পরীক্ষা করলে এটি লিঙ্গ সমতা, অর্থনৈতিক যুক্তি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে।
সন্দেহ জাগায় জামায়াতে ইসলামীর মূল উদ্দেশ্য নিয়ে, তারা কি নারীকে ঘরবন্দি করে রাখার প্রথম ধাপ হিসাবে এই পরিকল্পনা মাঠে এনেছে?
২০২২ সালের জনশুমারি অনুসারে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। যে দেশে প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নারী-পুরুষ উভয়ের কর্মশক্তিকে কাজে লাগানোর ওপর নির্ভর করে, সেখানে নারীর কাজের সময় কমিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের জন্ম দেয়।
যদি নারীরা দেশের মানবসম্পদের অর্ধেক অংশ হয়, তবে তাদের কম কাজ করতে উৎসাহিত করে কি আদৌ উন্নতি অর্জন করা সম্ভব? গৃহস্থালির কাজ কি কেবল নারীর একার দায়িত্ব? আর বিশ্বে কি এমন লিঙ্গ-নির্দিষ্ট শ্রম নীতির কোনো নজির আছে? এর উত্তর ‘না’।
নারী কর্মসংস্থানের বর্তমান অবস্থা একটি স্পষ্ট বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ২০২৩ সালের ২ কোটি ৪৫ লাখ থেকে কমে ২০২৪ সালে ২ কোটি ২৮ লাখে দাঁড়িয়েছে। এই বড় পতন অর্থনীতিবিদ এবং জেন্ডার বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
জাতিসংঘের উইমেন-এর সহযোগিতায় প্রস্তুত করা চলতি বছরের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত অর্থবছরের প্রথমার্ধে প্রায় ২১ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে, যার মধ্যে ১৮ লাখ বা ৮৫ শতাংশই ছিলেন নারী। ফলস্বরূপ, বর্তমানে মাত্র ১৯ শতাংশ নারী শ্রমবাজারে সক্রিয়, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।
এমন পরিস্থিতিতে, জামায়াতের পাঁচ ঘণ্টার প্রস্তাব নারীদের কর্মশক্তিতে অংশগ্রহণের নিম্নমুখী প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তোলার ঝুঁকি সৃষ্টি করে। নারী অধিকার প্রবক্তারা যুক্তি দেন, এই পরিকল্পনাটি নারীদের সুরক্ষার আড়ালে কার্যত তাদের কোণঠাসা করে দেবে।
এর ফলে নিয়োগকর্তারা পূর্ণ-সময়ের পদের জন্য পুরুষদের নিয়োগ দিতে বেশি আগ্রহী হতে পারেন। কারণ নারীরা কম ঘণ্টা কাজ করবে। তৈরি পোশাক শিল্পের মতো যে সমস্ত খাতে নারী কর্মী অর্ধেকেরও বেশি, সেখানে এই নীতি নারী-পুরুষ অসমতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফাউজিয়া মোসলেম উল্লেখ করেছেন, বিষয়টি কাজের সময় নিয়ে নয়, বরং সমতা এবং যৌথ দায়িত্ব নিয়ে।
কম সময় কাজ করলে মায়েরা সন্তানদের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে পারবেন–এ কথা শুনতে খুব উদার শোনায়। কিন্তু এটি সেই যুক্তিকে এড়িয়ে যায় যে, ঘরোয়া দায়িত্বগুলি নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা উচিত। নারীদের দাপ্তরিক কাজের সময় কমানো প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা নারী-পুরুষের কাজের বৈষম্যকেই আরও জোরদার করে।
এ ছাড়া কাজের সময় বা গণ্ডি সীমাবদ্ধ করে ফেললে নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনীতেও নারীরা পিছিয়ে থাকবে।
জামায়াতের এই পরিকল্পনা বাস্তবে প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন আছে। কোন কাজগুলো কম সময়ের জন্য উপযুক্ত হবে তা কে নির্ধারণ করবে? সরকার কি অর্থনীতিতে চাপ তৈরি না করে লাখ লাখ নারীর দৈনিক তিন ঘণ্টার বেতনের জন্য ভর্তুকি দিতে পারবে?
আর যেসব নারী পূর্ণ সময় কাজ করতে চান, তাদের কী হবে? তারা কি বৈষম্য বা বর্জনের শিকার হবেন? এসব নিয়ে জামায়াতের পরিকল্পনায় স্পষ্ট কোনো বক্তব্য নেই। এতে মনে হয়, আসছে নির্বাচনে নিম্ন আয়ের গোষ্ঠীর ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্যই রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর করছে জামায়াতে ইসলামী।
অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলামের মতো উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা এই ধারণাটিকে প্রগতিশীল নীতি প্রণয়নের চেয়ে পিতৃতান্ত্রিক অভিভাবকত্বের প্রতিফলন হিসেবে দেখেন। কোনো নারী সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা শ্রম অধিকার সংস্থা নারীদের জন্য কম কাজের সময় দাবি করেনি।
এর পরিবর্তে তারা ধারাবাহিকভাবে সমান বেতন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, পদোন্নতির সুযোগ এবং হয়রানি থেকে সুরক্ষার দাবি জানিয়েছে, যা মর্যাদা ও ক্ষমতায়নের প্রকৃত ভিত্তি।
বাংলাদেশ লিঙ্গ সমতা সংক্রান্ত জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে উল্লেখ করার মত অগ্রগতি করেছে। আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ সীমিত করে–এমন কোনো পরিকল্পনা সেই অগ্রগতিকে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে।
উন্নয়নের আসল চ্যালেঞ্জটি নারীর কাজের দিন সংক্ষিপ্ত করা নয়। বরং এমন কর্মক্ষেত্র তৈরি করা যা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নারীর কর্মপরিবেশের সহায়ক। যেখানে সকল লিঙ্গের জন্য নমনীয় সময়, শিশু পরিচর্যার সুবিধা এবং বৃদ্ধির জন্য সমান সুযোগ থাকবে।
জামায়াতের এই প্রস্তাবটি সম্মান এবং যত্নের ভাষায় মোড়ানো। তবে এটি ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি হিসেবে নয়, বরং নারীদের পুনরায় ঘরবন্দি করে তোলার একটি পিতৃতান্ত্রিক প্রচেষ্টা হিসেবে মনে করার ঝুঁকি রয়েছে।
মা এবং নারীদের প্রতি সত্যিকারের সম্মান তাদের কাজের সীমানা নির্ধারণে নয়, বরং তাদের স্বাধীনতা, সমতা এবং নিজেদের পথ বেছে নেওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত।


