দেশে সদ্য চালু হওয়া ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর পর কয়েক লাখ ভুয়া ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি (আইএমইআই) সম্বলিত মোবাইল ফোন শনাক্ত করা হয়েছে।
শনিবার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এ তথ্য জানান।
তিনি জানান, বর্তমানে মোবাইল নেটওয়ার্কগুলোতে লাখ লাখ ভুয়া ও ডুপ্লিকেট ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি (আইএমইআই) নম্বর সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ‘১১১১১১১১১১১১১’, ‘০০০০০০০০০০০০০’ এবং ‘৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯’ এর মতো ভুয়া আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করে কয়েক লাখ হ্যান্ডসেট সচল রয়েছে।
ক্লোন ও নকল হ্যান্ডসেট বন্ধে গত বৃহস্পতিবার থেকে বহুল প্রতীক্ষিত এনইআইআর সিস্টেম চালু করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষ নিম্নমানের ও নকল হ্যান্ডসেট ব্যবহার করছেন। এসব মোবাইল আমদানির সময় কোনো ধরনের নিরাপত্তা পরীক্ষা, ক্ষতিকর বিকিরণ বা রেডিয়েশন এবং স্পেসিফিক অ্যাবসর্পশন রেট (এসএআর) টেস্ট করা হয়নি। দেশের চারটি মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কজুড়েই এমন অনিবন্ধিত ও নিম্নমানের ফোনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ব্যবহারকারীদের অসুবিধার কথা চিন্তা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখনই এই মোবাইলগুলো বন্ধ করছে না। জনজীবন যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য এসব আইএমইআই নম্বরকে বর্তমানে ‘গ্রে’ বা ‘ধূসর’ তালিকায় রাখা হচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, গত ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কেবল ‘৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯৯’ আইএমইআই নম্বরের বিপরীতে বিভিন্ন পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে তিন কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৪টি সংযোগ সচল করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ভুয়া আইএমইআই নম্বরগুলো শুধু স্মার্টফোনে নয় বরং বিভিন্ন ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ডিভাইসেও থাকতে পারে।
বর্তমানে মোবাইল অপারেটররা মোবাইল ফোন, সিম দিয়ে অন্যান্য ডিভাইস এবং আইওটি ডিভাইসের আইএমইআই আলাদাভাবে চিনতে পারে না। ফলে সিসিটিভি ক্যামেরার মতো ডিভাইসগুলোও একই আইএমইআই নম্বরের অধীনে সচল থাকতে পারে। এই সমস্যা সমাধানে সরকার এখন থেকে বৈধভাবে আমদানিকৃত আইওটি ডিভাইসগুলোকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করছে।
গত এক দশকে শুধু একটি আইএমইআই নম্বরে ৩ কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৪ ফোন পাওয়া গেছে। বিভিন্ন কম্বিনেশনে (ডকুমেন্টস আইডি, এমএসআইএসডিডিএন, আইএমইআই) স্মার্টফোনের পাশাপাশি এ ধরনের আইএমইআই বিভিন্ন আইওটি ডিভাইসেরও হতে পারে। অপারেটর মোবাইল ডিভাইস, সিম সংযুক্ত ডিভাইস এবং আইওটি ডিভাইসের আইএমইআই আলাদা করতে পারে না। যেমন সিসিটিভি বা এ ধরনের ডিভাইস হয়ত একই আইএমইআই নম্বরে আনা হয়েছে। বৈধভাবে আমদানি করা আইওটি আমরা আলাদাভাবে ট্যাগের কাজ শুরু করেছি।
ফেসবুক পোস্টে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, শীর্ষ কিছু আইএমইআই নম্বরের একটা তালিকা তৈরি করে দেখা যাচ্ছে, একই আইএমইআই নম্বরে সাড়ে ১৯ লাখ ডিভাইসের ডিভাইস আনা হয়েছে। যেগুলো ডুপ্লিকেট হিসেবে আনা হয়েছে। এভাবে কোনো কোনো আইএমইআই নাম্বার দিয়ে কয়েক লাখ মোবাইল আছে। শুধু একটি শূন্য ডিজিটের আইএমইআই নম্বরে চলছে পাঁচ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩১টি ফোন।
কর্মকর্তারা জানান, মোবাইল নেটওয়ার্কে বিপুল পরিমাণ ক্লোন বা নকল হ্যান্ডসেটের উপস্থিতির কারণেই এমন চিত্র দেখা গেছে। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কগুলোতে এনইআইআর সিস্টেমের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদন মতে, ৭৩ শতাংশ ডিজিটাল জালিয়াতি ঘটে অনিবন্ধিত ডিভাইসের মাধ্যমে। এ ছাড়া ২০২৩ সালে ১৮ লাখ ফোন চুরির রিপোর্ট হয়, যার অধিকাংশই উদ্ধার করা যায়নি।
একই বছরে সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার মোবাইল চুরির অভিযোগ জমা পড়লেও প্রকৃত সংখ্যা আরও কয়েক গুণ বেশি। চুরি হওয়া এসব ফোনের বেশিরভাগই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।


