ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তির খবরে স্বস্তি নেমেছে গাজাবাসীর মনে। ইসরায়েলি বাহিনীর টানা বিমান হামলা ও সেনা অভিযান থেকে বৃহস্পতিবার রাতে রেহাই পেয়ে ‘শান্তির ঘুম’ নেমেছিল বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের চোখে। মুহুর্মুহু বোমার শব্দে আতঙ্কে জেগে ওঠা শিশুরাও প্রথমবারের মতো অশ্রুহীন রাত কাটিয়েছে। তাদের ক্লান্ত শরীর যেন প্রথমবারের মতো নির্ভয় রাত পেয়ে একটু জিরিয়ে নিল।
গাজা থেকে আল জাজিরাকে এমনই এক আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক হানি মাহমুদ।
বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয় শিবিরের পাশেই আল-জাজিরার সম্প্রচার কেন্দ্র। যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকেই একের পর এক সাংবাদিক সেখানে ছুটে গিয়েছেন সংবাদ প্রচারের লক্ষ্যে। তাদের সবাই অবাক চোখে দেখেছেন, শিবিরের প্রতিটি তাবুতে পিনপতন নিরবতা। সবাই ঘুমে কাতর।
হানি বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, তারা (ফিলিস্তিনিরা) এই সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছেন। বহু মাস পরে আজ রাতটা শান্ত। তারা একটু বিশ্রাম নিতে চাইছেন… কখন আবার ছুটে পালাতে হয়!’
তিনি বলেন, ‘এর আগের যুদ্ধবিরতিগুলোতে আমরা গাজায় আনন্দ দেখেছি, প্রিয় মানুষের ঘরে ফেরার অপেক্ষা দেখেছি, দেখেছি উল্লাস এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজাকে ফের গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি।’
‘তবে এবারের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর গাজার এক ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। উল্লাসের বদলে আমরা দেখেছি স্বস্তি। ঘুমন্ত শিশুকে নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে ছুটতে হবে না-সেই স্বস্তি। ছুটতে ছুটতে পেছন ফিরে কাছের মানুষের নিথর দেহ পরে থাকতে দেখতে হবে না-সেই স্বস্তি। শিশুর মুখে এক বেলা খাবার যোগাতে শত শত কিলোমিটার আতংকে চলতে হবে না- সেই স্বস্তি।’
হানি মাহমুদ বলেন, ‘আমরা গাড়ি করে পুরো রাত বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের শিবিরে শিবিরে ঘুরেছি। হাজার হাজার ফিলিস্তিনি এসব তাবুতে গিজগিজ করছে। কিন্তু আমরা তাবুর বাইরে তেমন কাউকে দেখিনি। এমনকি রাস্তায়ও কোনো মানুষ দেখিনি। সবাই নিজ নিজ তাবুতে ঘুমে আচ্ছন্ন।’
‘গত কয়েক সপ্তাহে, গাজার মানুষ ঘুমের “বিলাসিতা” পায়নি’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তারা সবসময় অতিমাত্রায় সতর্ক অবস্থায় ছিলেন। যেভাবে নির্বিচারে ড্রোন হামলা, বিমান হামলা এবং গাজা উপত্যকাজুড়ে অবিরাম গোলাবর্ষণ চলছিল- গাজাবাসী নিজেদের প্রাণ হাতে ছুটে পালানোর জন্য সবসময় প্রস্তুত ছিলেন। তারা প্রতি রাতে, প্রতিটি মুহূর্তে সজাগ ছিলেন।’
‘কিন্তু আজ রাতে, অস্বাভাবিকভাবে, যখন আমরা গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির খবর পেলাম, তখন আর প্রত্যাশিত আনন্দ কারও চোখে দেখতে পেলাম না। সবাই ক্লান্ত, সবাই ক্ষুধার্ত’, বলেন হানি।
এই ফিলিস্তিনি সাংবাদিকের মতে, এই ঘুমন্ত গাজাবাসীর জন্য নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারার সৌভাগ্য খুবই দামী। এটি সম্পদের চেয়ে কম নয়।
তবুও প্রশ্ন রাখেন এই সাংবাদিক। জানতে চান, ‘এতেই কি সবকিছু বদলে যায়? একটি যুদ্ধবিরতি কি গাজায় শান্তি আনতে পারে? যেখানে পথে ঘাটে মরদেহের সারি, রক্তের দাগ, সন্তানদের কবর… সেখানে একটি নিরব রাত কি আসলেই শান্তি এনেছে?’


