ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটন কোনো চুক্তি করবে না বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ এরইমধ্যে দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। ইরানের বাইরে লেবাননেও সমান্তরালে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে এই সংঘাত কবে এবং কীভাবে শেষ হবে- সে বিষয়ে অনিশ্চিত গোটা বিশ্ব।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না যদি না তারা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে। এই সংঘাত তখনই থামবে যখন ইরান আমাদের শর্ত মেনে নেবে।’
তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইরান নতুন ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব বেছে নিলে ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররাই তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
এর আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানান, কয়েকটি দেশ যুদ্ধ থামাতে মধ্যস্থতার চেষ্টা শুরু করেছে। তবে কোন দেশগুলো এই উদ্যোগ নিয়েছে তা নিশ্চিত করেননি তিনি।
বিভিন্ন দেশে হামলা ও পাল্টা হামলা

এদিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য অঞ্চলের প্রতিবেশীগুলোতে পালটা হামলা চালিয়েছে তেহরান। মূলত উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করেই এসব পালটা হামলা হয়েছে।
শুক্রবার ইসরায়েলের আকাশেও একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও সৌদি আরবেও নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া যায়।
অন্যদিকে ইরানের পাশাপাশি লেবাননে হামলা আরও জোরদার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। দেশটির রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ উপশহর খালি করার নির্দেশ দেওয়ার পর আইডিএফ শুক্রবার সেখানে পুরোদমে বোমা হামলা শুরু করেছে।
ইসরায়েলের দাবি, তাদের প্রায় ৫০টি যুদ্ধবিমান একযোগে ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে হামলা চালিয়েছে। ওই বাঙ্কারেই ইরানের নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তারা আশ্রয়ের জন্য ব্যবহার করছিলেন।
শনিবার ভোরে তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরেও হামলার খবর দিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযানের প্রথম সপ্তাহেই তারা ইরানের প্রায় ৮০ শতাংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে এবং অর্ধেকের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা অকার্যকর করেছে।
ইরান যুদ্ধের জেরে লেবাননে বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষ

ইরানের পাশে দাঁড়ানোয় লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ফের যুদ্ধ শুরু করেছে ইসরায়েল। গত চার দিনে লেবাননের দক্ষিণ সীমান্ত থেকে প্রায় তিন লাখ মানুষ বাস্তচ্যুত হয়েছে বলে জানিয়েছে নরওয়েইয়ান রেফিউজি কাউন্সিল।
বৈরুতের দক্ষিণ উপশহর থেকে পালিয়ে আসা জামাল সাইফেদ্দিন রয়টার্সকে বলেন, ‘অনেক মানুষ এখন রাস্তায় রাত কাটাচ্ছে-কেউ গাড়িতে, কেউ ফুটপাথে আবার কেউ সমুদ্রতীরে আশ্রয় নিয়েছে।’
ক্রমাগত বাড়ছে নিহতের সংখ্যা

ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারির শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ইরানে অন্তত এক হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছেন। এরমধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের মেয়ে শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালানো হামলায় দেড়শ জনের বেশি নিহত শিশুও রয়েছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় এরইমধ্যে ১২৩ জন নিহত এবং ৬৮৩ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের পালটা হামলায় ইসরায়েলে ১১ জন নিহত হয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ছয়জন সেনা সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে অস্থির হয়ে ওঠেছে আন্তর্জাতিক বাজারও। ট্রাম্প ইরানের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবির পর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় পতন হয়েছে।
একই সঙ্গে তেলের দাম গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কারণ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জেরে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে ইরান সরকার।


