শিক্ষা খাতের অনাচার এবং শিক্ষাঙ্গনের রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে নিয়মিত প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের শিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রথম সারির মুখ হিসেবে রাজপথেও সোচ্চার ছিলেন তিনি। চেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গবেষণাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে। কিন্তু দুই বছর পর সেই আকাঙ্ক্ষা কতখানি পূরণ হয়েছে তা নিয়ে এই শিক্ষাবিদ খোলামেলা কথা বলেছেন টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিবেদক আলীম হায়দারের সঙ্গে।
টাইমস: আপনি জুলাই আন্দোলনে ছিলেন সক্রিয় মুখ। এত বড় পরিবর্তনের পরও কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলেই মনে হচ্ছে। কেন এমন হলো?
অধ্যাপক কামরুল: নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান আমরা খুব কাছে থেকে দেখেছি। তখনও মানুষের মধ্যে একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল। মানুষের সেই আকাঙ্ক্ষা কি পূরণ হয়েছে? খুব দ্রুতই মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে কবরে পাঠানো হয়েছে। গণআকাঙ্ক্ষার তেমন কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। তাহলে কী হয়েছে? নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালে যখন প্রথম নির্বাচিত বিএনপি সরকার এসেছে, মোটামুটি ভালোই ছিল। কিন্তু অনেক ভালোর মধ্যেও আবার তৎকালীন বিরোধী দলকে একটু ঝামেলাতেও ফেলেছে, মানে নানা ধরনের অত্যাচার-অবদমন। এতে বিরোধী দল মানে তৎকালীন আওয়ামী লীগের মধ্যে রাগ তৈরি হয়েছে। পরবর্তীতে তারা যখন ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জিতল, আওয়ামী লীগ তখন প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আরও কিছুটা বেশি অত্যাচার ও অবদমন করে বিরোধী দল বিএনপিকে।
এর ফলে বিএনপির মধ্যেও প্রচণ্ড ক্ষোভ তৈরি হতে থাকে, ২০০১ সালে বিএনপি যখন আবার ক্ষমতায় আসে, তখন সেই পুরোনো ক্ষোভ প্রশমন করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের ওপর নির্যাতন অত্যাচার আরও বাড়িয়ে দেয়, এমনকি গ্রেনেড হামলা পর্যন্ত হয়ে গেছে।
এরপর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন আবার সরকারে আসে, এবার রাগের প্রকাশটা হয়ে পড়ে অসীম। তারা তখন ক্ষোভ থেকে এমন ব্যবস্থা করেছে. যেন বিএনপি আর কখনো ক্ষমতায় আসতে না পারে। একটার পর একটা প্রহসনের নির্বাচন! এসবের ফলে নব্বইয়ের গণআন্দোলনের আকাঙ্ক্ষাটা ধীরে ধীরে একদম শেষ হয়ে যায়।
তবে এক-এগারোর সময়েও কিন্তু আমাদের একটা আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। তারা ক্ষমতায় এসে অসৎ মানুষদের ধরছিল, দুর্নীতি-সন্ত্রাস দমন করছিল, তখনও মানুষের মনে এক ধরনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। সেটাও শেষ। ঠিক এভাবেই ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর গণমানুষের মনে যে আকাঙ্ক্ষা জন্মেছিল, সেগুলোও খুব দ্রুত অপমৃত্য হয়েছে।
টাইমস: এই দায় কী শুধুই রাজনীতিবিদদের?
অধ্যাপক কামরুল: অবশ্যই তাদের দায় আছে। আমলাদেরও দায় আছে। শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন বা সংস্কারের জন্য তারা তো প্রকৃত শিক্ষাবিদদের পরামর্শই নেন না। আর কেউ ভালো পরামর্শ দিলেও তা ফেলে রাখা হয়। শুধু নিজেদের দলীয় স্বার্থের সঙ্গে মেলে এমন ব্যক্তিদের দিয়ে কাজ করা হয়, বৃহত্তর স্বর্থে আর কিছুই হয় না। আগেও এভাবেই চলেছে, এখনো চলছে।
তবে রাজনীতিবিদরা তথা সরকার চাইলে পরিস্থিতি দ্রুতই পরিবর্তন করতে পারে। চীনের সরকার চেয়েছে, এজন্য চীন আজ শিক্ষা ও গবেষণায় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থান অর্জন করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকা সরকার মেধাবী শিক্ষক-গবেষকদের পৃষ্ঠপোষকতার নীতি নিয়েছিল। এজন্য তারা শিক্ষাদীক্ষায় বিশ্বে শীর্ষে উঠেছে এবং সুপার পাওয়ারে পরিণত হয়েছে। এমনকি ভারতের অবস্থাও অনেক বদলে গেছে।
তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে যদি শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার চান এবং সেভাবে দেশ-বিদেশের ভালো শিক্ষাবিদদের নিয়ে এসে শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে চান, শুধু তাহলেই সম্ভব। তাছাড়া মন্ত্রী ও আমলাতন্ত্রের ব্যক্তিরা তো বিশেষজ্ঞ না, তারা ক্ষমতার জোরে স্বেচ্ছাচারিতা করে কোনো পরিবর্তন আনতে পারবেন না।
এই দেশে বারবার গণআকাঙ্ক্ষাগুলার অপমৃত্যুর কারণ হলো- আমাদের রাজনীতিবিদরা, আমাদের বুদ্ধিজীবীরা এতই স্বার্থপর, এতই দলকানা যে, এরা কখনো দেশের ভালো চায়নি। এরা সুযোগ পেলে শুধু নিজের স্বার্থ দেখে, দলের স্বার্থ দেখে, দেশের স্বার্থ দেখে না। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের যে স্পিরিটটা ছিল, এমনকি একাত্তরের স্পিরিট- আমাদের কোনো স্পিরিটই কখনো কাজে আসেনি।
টাইমস: নতুন বাংলাদেশ গঠনের যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা হওয়ার কথা ছিল ‘শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার’। আসলে কী পরিবর্তন হয়েছে?
অধ্যাপক কামরুল: সুশিক্ষা একটা জাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জাতির মেরুদণ্ড। এখন মেরুদণ্ড যারা বানাবে, তাদের মেরুদণ্ডই ভাঙা। বেতনের মাধ্যমে ভাঙা, সামাজিক মর্যাদায় ভাঙা, প্রাথমিক-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যখন আন্দোলন করে তাদের লাঠিপেটা করা হয়।
শিক্ষকদের বেতনের দাবিতে রাস্তায় আসতে হবে কেন? কারণ শিক্ষাটা আসলে এই দেশের কখনোই অগ্রাধিকারের মধ্যে ছিল না।
শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রের যে আচরণ তা দেখে, শিক্ষার্থী-অভিভাবক এমনকি অনেক স্থানীয়রাও শিক্ষকদের সহজ টার্গেটে পরিণত করছে। ডিজিটাল ক্লাসরুম, স্মার্ট বোর্ড এসব না বানিয়ে আগে ভালো শিক্ষক বানানো প্রয়োজন। তাদের জন্য ভালো প্রশিক্ষণ, ভালো বেতন, সামাজিক মর্যাদা এসব নিশ্চিত করা দরকার। একজন ভালো শিক্ষক গাছতলায় পড়িয়েও ভালো শিক্ষার্থী তৈরি করতে পারেন।
টাইমস: অন্তর্বর্তী সরকার তো শিক্ষা সংস্কারে কোনো কমিশনও করেনি। শিক্ষক নেটওয়ার্ক থেকে সচেতন শিক্ষকরাও এ বিষয়ে কোনো ভূমিকা রাখলেন না কেন?
অধ্যাপক কামরুল: শিক্ষক নেটওয়ার্ক তো মাত্র কয়েকজন শিক্ষক? এই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানটা যে হয়েছে, এর পটভূমি তৈরিতেও অনবদ্য ভূমিকা রেখেছে শিক্ষক নেটওয়ার্ক। সুশীল সমাজ বা শিক্ষিত সমাজের মানুষদের কাছে তাদের একটা আলাদা গ্রহণযোগ্যতা আছে। আমরা যখন কর্মসূচি দিয়েছি, তখন বিএনপি এবং জামায়াতের লোকেরা আমাদের কাছে জানতে চেয়েছে, তারা আসতে পারবেন কি না। উনারা এসে আমাদের পেছনে এসে দাঁড়াতেন। আওয়ামী লীগ সরকার তাদের যেভাবে চাপে রেখেছিল, তাতে তাদের পক্ষে সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে দাঁড়ানোর সাহসও ছিল না। আমরা যখন সামনে থেকে আন্দোলন করে গেছি, তারা তখন পেছনে। এরপর যখন চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান হলো, তারা পুরা জিনিসটাকে উল্টিয়ে দিল।
আমরা যেহেতু সংখ্যায় কম, তারা ‘ওভার হোয়েমিংলি’ সংখ্যায় এতো বেশি, তারা সবাই যদি চায় ‘স্পিরিটটা’কে নষ্ট করে ফেলবে, তাহলে শিক্ষক নেটওয়ার্কের ১০-১২ জন শিক্ষক তা ঠেকাতে পারে না। এছাড়াও আমাদের শিক্ষক একটা পরিবার আছে, ক্লাসের দায়িত্ব আছে, গবেষণার কাজ আছে। আমরা তো ফুলটাইম প্রতিবাদের জন্য রাজপথে থাকব না। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর তা থাকে এবং তাদের সেই সদিচ্ছার অভাবেই শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার আনা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কোনো পরিবেশই রাখা হয়নি।
টাইমস: বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্নমত দমনের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন আপনি। এখন যারা ক্ষমতায়, তাদের বিপক্ষে কথা বলা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রীতিমতো কমিটি করা হয়েছে। কয়েকজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো, যাদের কারণ দর্শানোর সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।
অধ্যাপক কামরুল: আমি খুব করে চাই এই বিষয়ে বলতে। এটি খুব সময়োপযোগী ও জাতির জন্য (বার্নিং) জরুরি প্রশ্ন। এই প্রশ্ন করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। কারণ আমরা ইতোমধ্যে শুনেছি, বিচার করার জন্য ২৩১ জন শিক্ষকের তালিকা করা হয়েছে। শুধু কি শিক্ষক? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী শুধু ছাত্রলীগ করত বলে ক্লাস এবং পরীক্ষা দিতে পারছে না। এই যে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বা কলেজে শ্রেণিকার্যক্রমে অংশ নিতে পারছে না এবং পরীক্ষা দিতে যেতে পারছে না, এরা কারা? এরা তো আমাদেরই সমাজের একটা অংশ। এরা যদি এই লেখাপড়া শেষ করতে না পারে, এরা এই সমাজের বোঝায় পরিণত হবে। এদের অনেকে মাদকাসক্ত হবে, অনেকে মাস্তান বা অনেক খারাপ কিছু হতে পারে। ওই খারাপের শিকার সবাইকে হতে হবে।
এই যে শত শত ছেলেমেয়েদের আমি ক্লাসে আনতে পারছি না, এটা নিয়ে কেউ ভাবছি না, এটা একটা মারাত্মক সংকট তৈরি করবে। কারণ এত ছেলেমেয়েকে এইভাবে ক্লাসের বাইরে রাখা…. এটা আওয়ামী লীগ যখন ছাত্রদলকেও বাইরে রেখেছে তখনও আমি বলেছি, এটা ঠিক না। এখনো আমি বলি, এটা ঠিক হচ্ছে না।
কারণ কেউ অপরাধী হলে তার বিচার হোক। তবে সেই বিচারেরও অবশ্যই একটা প্রসিডিউর থাকতে হবে। ইচ্ছামতো করলে হবে না। কোনো ধরনের অরাজকতা তৈরি না করে আমি প্রশাসনের কাছে এসবের সুষ্ঠু সমাধানের দাবি জানাই। একইভাবে শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও… এই যে ২৩১ জন শিক্ষক, তাদের প্রত্যেকেরই পিএইচডি আছে এবং তাদের প্রায় সবাই অধ্যাপক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যদি একসঙ্গে এই ২৩১ শিক্ষককে সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে এই বিশ্ববিদ্যালয় পঙ্গু হয়ে যাবে। কারণ সবাই তো এখানে খারাপ না, নিশ্চয়ই খারাপ না। অনেকে নীল দল করেছে, অনেকে বাধ্য হয়ে করেছে। যেমনভাবে অনেকে ছাত্রলীগ করেছে, অনেকে করতে বাধ্য হয়েছে। অনেককে জোর করে মিছিলে নেওয়া হয়েছে বা একপর্যায়ে তারা নিজে থেকেই এটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।
টাইমস: অন্য শিক্ষকরা এটা নিয়ে কথা বলছেন না কেন?
অধ্যাপক কামরুল: এরা এখন বিশাল আনন্দে আছে। এরা ইউফোরিয়ার মধ্যে ভুগছে। ইউফোরিয়ায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে গেছে। যা ইচ্ছা তা করছে। মানে দলীয়করণের চরম সীমা- প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অনেক এমপির স্ত্রী স্কুল-কলেজের ম্যানেজমেন্ট কমিটি পর্যন্ত দখল করে বসে আছেন। কোনো নেতা, চেয়ারম্যান ও এমপির স্ত্রী-সন্তানদের এসব করার জন্য এত ছেলেমেয়ে আত্মদান করেনি।
টাইমস: উচ্চশিক্ষা রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের বাইরে যাওয়ার সুযোগ কি একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল? এখানে জ্ঞানের চেয়ে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাই তো বেশি প্রভাবশালী দেখা যাচ্ছে।
অধ্যাপক কামরুল: সম্প্রতি উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলো দেখছি। এখন যত পদায়ন হচ্ছে, সব তো সাদা দলের। একসময় এটা যেমন নীল দলের হতো।
তার মানে কী? আগে আওয়ামী লীগ যে কাজটা করেছে, নিজ দল ছাড়া কাউকে পদ দেয়নি, শিক্ষক নিয়োগ দেয়নি, ভিন্ন মতের কারণে অনেক যোগ্য মানুষ যোগ্য পদে যেতে পারেনি। এখন এরাও তো একই ফ্যাসিবাদী কাজ করছে। আগের অন্যায়ের প্রতিবাদ করে বিশাল বিপ্লব করা হলো। কিন্তু এখনো সেই কাজটাই তো আবার করা হচ্ছে। এটা তো একটা সুস্থ ধারার রাজনীতিও হলো না।
একটা সুস্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করার ক্ষেত্রে এটা কোনো ইতিবাচক ভূমিকা পালন করা তো দূরের কথা, উল্টো শিক্ষার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতি করবে। আমার মনে প্রশ্ন জাগছে, এই প্রতিহিংসার রাজনীতি কি শেষ হবে?
এর মানে হলো আমরা তো হিংসা এবং প্রতিশোধপরায়ণতায় বীজ বপন করছি। যে কাজ আওয়ামী লীগ করছিল, যার প্রতিফলন তারা পেয়েছে। এই সরকারও সেই কাজই করছে।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ একজন দুইজন করে না। এরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাংলাদেশে আছে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দেড় দশকের দুঃশাসনে বিরক্ত হয়ে সাধারণ মানুষ যখন একসময় রেগে গিয়েছিল, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ভবিষ্যতেও একই পরিণতি অপেক্ষা করছে। একসময় মানুষ বাইরে আসবে। আটটিয়ে কতদিন রাখা যাবে। আমরা যারা সচেতন শিক্ষক, সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলি, আমরা আগেও যেমন অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি, এখনো করছি। আমাদের প্রতিবাদগুলো তো এদের ফিরে আসা পাটাতন তৈরি করবে। কারণ ওরা অন্যায় করবে, আমরা তো প্রতিবাদ করব।
শিক্ষকদের বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে আমদের শিক্ষক নেটওয়ার্ক থেকে বিবৃতি দিয়েছি। আমাদের বিবৃতিগুলা যেকোনো অন্যায়ের প্রতিবাদে মানুষের ফিরে আসার পাটাতন তৈরি করবে।
টাইমস: আনন্দময় শিক্ষা ও শিক্ষাকে আধুনিকীকরণের বিষয়ে বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও ধর্মভিভিত্তিক গোষ্ঠী বাধা দিয়েছে, এখনো একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকাকে নিয়ে নানারকম বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে। ধর্মগোষ্ঠী কি শিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক হয়ে যাচ্ছে?
অধ্যাপক কামরুল: অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমাদের দেশের একটা দল মনে করেছিল, তারা ক্ষমতায় আছে বা ক্ষমতার পেছনে তারাই আছে। মানে ওই দলের নেতারা যখন আন্দোলনে গেছে বা বিভিন্ন রাস্তায় হেঁটেছে, অধিকাংশ গণমাধ্যমও তাদের পেছনে হেঁটেছে, তাদের এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যে তারাই সব, এমনকি চাকরিপ্রার্থী মানুষও তাদের কাছে ধরণা দিয়েছে।
তারা তো এমন একটা গোষ্ঠী, তারা গান-নাচ পছন্দ করে না, তারা সুফিজম পছন্দ করে না, বাউল গান পছন্দ করে না, তারা আমাদের জাতীয় সংগীত পছন্দ করে না। একটা দেশে এমন একদল মানুষ তৈরি করছি আমরা, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও যারা জাতীয় সংগীতবিরোধী, যারা রবীন্দ্রনাথবিরোধী…..অ্যাবসার্ড!
এরা কিন্তু আবার চাকরির জন্য এবং জীবিকার জন্য ঠিকই বিজ্ঞান পড়বে। কিন্তু বিজ্ঞানের ডারউইন মতবাদ মানবে না, এদেরই কাজ আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিনষ্ট করা।
আমাদের গ্রামে ঘরের ছাদ বানানোর গান আছে, নৌকা বাইচের গান আছে, বিয়ের গীত আছে, ফসল কাটা ও মারার আছে গান আছে, তার মানে এই দেশের মানুষ গানপ্রিয়। আর একদল মানুষ এখন তো হঠাৎ করে চলে আসছে, গান গাওয়া যাবে না বা নাচা যাবে না মত নিয়ে।
পদার্থ বিজ্ঞানের সবচেয়ে মেধাবী মানুষগুলোর মধ্যে আইনস্টাইন বেহালা বাজাতেন, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জন প্লাঙ্ক বাজাতেন পিয়ানো, আমাদের সত্যন বোস বাজাতেন এশরাজ, অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ফাইনম্যান সেত বঙ্গ ও ড্রাম বাজাতেন। মিউজিক আর সায়েন্স পড়াশোনা কানেক্টেড। লেখাপড়া থেকে যদি আমি মিউজিক উঠিয়ে দিই, ওই লেখাপড়াটা আনন্দময় হবে না।


