ত্রয়োদশ সংসদ কি হতে পারবে প্রত্যাশার প্রতিচ্ছবি?

ত্রয়োদশ সংসদ কি হতে পারবে প্রত্যাশার প্রতিচ্ছবি?
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

আগামী ১২ মার্চ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তারিখটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রপতি আহূত ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে ওইদিন। দীর্ঘ দেড় বছরের বেশি সময় পর একটি নির্বাচিত প্রতিনিধি সংসদ পথচলা শুরু করতে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর সংসদে একটি সক্রিয় ও শক্তিশালী বিরোধীদল তাদের আসন গ্রহণ করতে চলেছে। এই দৃশ্য বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি মাইলফলক।

দ্বাদশ সংসদের পতনের পথপরিক্রমা ছিল বেদনাদায়ক। টানা তিনটি সংসদ প্রকৃত বিরোধী দলবিহীন সংসদীয় ব্যবস্থা কার্যত এক দলীয় শাসনে পরিণত হয়েছিল। মূলত স্বাধীনতার পর থেকেই এখানে প্রকৃত সংসদ প্রতিষ্ঠা হতে পারেনি। এমনিতেই ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার পতনের পর সংসদীয় ব্যবস্থায় ফেরার পরও সংসদ খুব কার্যকর ছিল না। নানা দাবি দাওয়া আর আন্দোলন সংগ্রামে বেশিরভাগ সময়ই বিরোধী দলকে সংসদের বাইরে দেখা গেছে। তাই সংসদে আলোচনা ছিল আনুষ্ঠানিকতা, আর সংসদের বাইরে ক্ষোভ ছিল ক্রমবর্ধমান। সেই ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত একটি রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দিল।

ছাত্র-জনতার সেই অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারকে ভেঙে দেয়নি, ভেঙে দিয়েছিল একটি অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেও। এরপর দেড় বছরের বেশি সময় অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দিকে নিয়ে যায়। গত ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশ পেল নতুন সরকার, পেল নতুন জনপ্রতিনিধি।

এখন প্রশ্ন হলো, এই ত্রয়োদশ সংসদ কীভাবে নিজেকে কার্যকর করে তুলতে পারে। কীভাবে এটি মানুষের মনে দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশা দূর করে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এর উত্তর লুকিয়ে আছে সংসদের অভ্যন্তরীণ চর্চা এবং দলগুলোর রাজনৈতিক পরিপক্বতার মধ্যে।

প্রথমত, এই সংসদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হতে হবে এর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র। সংবিধান অনুযায়ী, সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলিয়েই পূর্ণাঙ্গ সংসদ। দীর্ঘদিন পর আমরা সেই পূর্ণাঙ্গ সংসদ পেতে যাচ্ছি। উভয় দল ইতোমধ্যে হুইপ ও চিফ হুইপ নিয়োগ দিয়ে সংসদীয় কৌশল সাজানো শুরু করেছে।

আরও পড়ুন

এখন প্রধান কাজ হলো এই দুই পক্ষের মধ্যে একটি সুস্থ ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা। বিরোধী দলের ভূমিকা শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়, বরং সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া। সরকারের উচিত হবে বিরোধী দলের বক্তব্যকে শত্রুতার নয়, বরং সংসদকে সমৃদ্ধ করার একটি উপকরণ হিসেবে দেখা।

দ্বিতীয়ত, সংসদীয় কমিটিগুলোকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে। আইন প্রণয়ন ও বাজেট পর্যালোচনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। এই কমিটিগুলোতে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা একসঙ্গে কাজ করবেন। কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে সরকারের বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। যদি কমিটির রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপন ও আলোচনা বাধ্যতামূলক করা যায়, তাহলে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া হবে আরও স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক।

তৃতীয়ত, সংসদকে সময় দিতে হবে প্রশ্নোত্তর পর্বকে। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো এই প্রশ্নোত্তর পর্ব। এটাকে যেন নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত না করা হয়। বিরোধী দলের সদস্যরা যাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রশ্ন করতে পারেন এবং সরকার যাতে যথাযথ জবাব দিতে বাধ্য থাকে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, স্পিকারের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু প্রথম দিনের জন্য নয়, পুরো সংসদের মেয়াদ জুড়েই স্পিকারকে নিরপেক্ষ ও সবার জন্য গ্রহণযোগ্য থাকতে হবে। বিরোধী দলের কণ্ঠ যাতে কখনো স্তব্ধ না হয়, সেদিকে স্পিকারের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। স্পিকারকে হতে হবে সংসদের অভিভাবক, সরকারের নয়।

পরিশেষে, সংসদকে হতে হবে জাতির আয়না। মানুষের প্রত্যাশা, তাদের দুঃখ-বেদনা, স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে এই কক্ষে। দীর্ঘদিন এককেন্দ্রিক ও অনির্বাচিত সরকার দেশ চালানোর ফলে মানুষের মনে যে হতাশা দানা বেঁধেছিল, এই সংসদকেই সেই হতাশা দূর করতে হবে। আমাদের সাংসদদের মেধা, মনন ও দেশপ্রেম দিয়ে প্রমাণ করতে হবে, গণতন্ত্রই সর্বোৎকৃষ্ট শাসনব্যবস্থা। ত্রয়োদশ সংসদ শুধু একটি আইনসভা নয়, এটি হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতীক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এরকম একটি কার্যকর সংসদই আমরা দেখতে চাই।

লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad