রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগ ও তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি—এমন আলোচনায় রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। যদিও বঙ্গভবন বা সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবুও আলোচনার সূত্রপাত লন্ডনপ্রবাসী অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে।
খবরের চেয়েও বেশি আলোচিত হচ্ছে—জনপ্রশাসনের একজন কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রপতি করার যৌক্তিকতা ও এর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে, সংকটময় এই সময়ে একজন আমলাকে রাষ্ট্রপ্রধান করা কি দেশের জন্য মঙ্গলকর, নাকি গণতান্ত্রিক চর্চায় দলীয় শক্তিকে গুরুত্ব দেয়া উচিত?
রাষ্ট্রপতির পদ: সংবিধান ও বাস্তবতা
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ কর্তৃক নির্বাচিত হন এবং তাঁর মেয়াদ পাঁচ বছর। বাংলাদেশে এই পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক ও প্রতীকী। রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগে স্বাধীন ক্ষমতা রাখলেও অন্যান্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন। তবে রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে সংকটময় মুহূর্তে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এদেশে এর উজ্জ্বল ও অন্ধকার উভয় দৃষ্টান্ত বিদ্যমান।
রাজনৈতিক পটভূমি ও দলীয় প্রত্যাশা
দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বর্তমান নির্বাচিত সরকার গঠন করেছে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। বিএনপির অসংখ্য নেতা-কর্মী জেল-জুলুম, মামলা-হামলা, গুম-খুনের শিকার হয়েছেন। দলের তৃণমূল থেকে শুরু করে যুব, ছাত্র, পৌর—সব স্তরের নেতাকর্মীরা ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে যেমন দলকে বাঁচিয়েছেন, তেমনি ফ্যাসিবাদী চক্রকে প্রতিহত করে দেশকে গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে এনেছেন। এই প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই দলের ভেতর থেকে যোগ্য কাউকে মূল্যায়নের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।
বিশেষ করে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার পতনের পর ১৯৯১ সালের গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকেই রাষ্ট্রপতির সরকার পরিচালনায় তেমন ভূমিকা না থাকলেও রাষ্ট্রের প্রধান সম্মানীয় ব্যক্তি হিসেবে দলীয় কোনো নেতাকে এই পদে বসানোর চাওয়া দীর্ঘদিনের। দলীয় নেতৃত্বের মধ্যে থেকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে প্রয়োজনে বিরোধী দলের সঙ্গেও সংলাপের মাধ্যমে সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারেন—এ যুক্তি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রবল।
দলীয় বনাম সুশীল রাষ্ট্রপতি: অতীতের অভিজ্ঞতা
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি আমলের রাষ্ট্রপতিদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য চোখে পড়ে। ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের পূর্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস একটি অগণতান্ত্রিক প্রচেষ্টাকে সফল ভাবে মোকাবেলা করতে পেরেছিলেন। আবার ২০০১ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদকে নিয়ে আওয়ামী লীগ নিজেরাই প্রশ্ন তুলেছিল। পরবর্তীতে দলীয় নেতা জিল্লুর রহমান ও তাঁর মৃত্যুর পর আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি হন। আব্দুল হামিদ রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণে বিরোধী দলের আন্দোলনের সময়ও প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে বৈঠক করে দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন, সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখতে সচেষ্ট হয়েছেন; যদিও পুরোপুরি সফল হতে পারেননি। এটা সম্ভব হয়েছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতার কারণে।
অন্যদিকে রাজনীতির বাইরে থেকে রাষ্ট্রপতি বানানো অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ কিংবা বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন—কেউই কোনো সঙ্কটময় মুহূর্তে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি। এমনকি যে দল তাদের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করেছে, সে দলকেও রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন তাঁরা। রাজনীতির গভীরতা, দলীয় সম্পর্ক ও জনসংযোগের অভাবে তাঁরা সংকটকালে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারেননি। এটি একটি শক্তিশালী যুক্তি যে, রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবিহীন কেউ রাষ্ট্রপতি হলে জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: সংকটের খনি
বর্তমান সময়টি অত্যন্ত জটিল। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে সাংবিধানিক সংস্কার ও গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের বিষয়ে জামায়াত-সমর্থিত বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন অব্যাহত আছে। চরম বিভাজিত সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সরকারকে বিপরীতমুখী চাপ সামলাতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত হতে পারেন।
একজন আমলার পক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ তৈরি করা, সংকটের সময় উদ্যোগ নেয়া—অত্যন্ত কঠিন। আমলাতন্ত্রের অভ্যাস হলো নির্দেশ পালন করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ নয়। অন্যদিকে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সহজেই আলোচনার টেবিলে বসতে পারেন। তাই সময়ের বিবেচনায় সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও সকল মহলের কাছে গ্রহণযোগ্য একজন রাষ্ট্রপতি থাকা সরকার ও রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কাম্য।
গণতান্ত্রিক দাবি ও রাজনৈতিক যৌক্তিকতা
দলীয় নেতাকর্মীদের দাবি স্পষ্ট—রাষ্ট্রপতি পদটি যেন দলের মধ্য থেকেই পূরণ করা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে দলের ভেতরে ঐকমত্য তৈরি করা জরুরি। সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই কাজ করেন, কিন্তু সঙ্কটকালে দলীয় পরিচয় তাঁকে আরও সাহসী ও উদ্যোগী করে তোলে। দলীয় কোনো নেতা রাষ্ট্রপতি হলে তিনি দল, সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে একটি যোগসূত্র হিসেবে কাজ করতে পারেন, যা বর্তমান বিভাজিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আবার অনেকে মনে করেন, রাষ্ট্রপতি পদটি নিছক আনুষ্ঠানিক, তাই দলীয় হোক বা আমলা—মূল বিষয় হচ্ছে ব্যক্তিগত দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছাড়া কোনো ব্যক্তিই সংকট মোকাবিলায় সফল হননি। তাই দলীয় বিবেচনার পাশাপাশি ব্যক্তির যোগ্যতা, সততা ও গ্রহণযোগ্যতা—এই তিনটি মানদণ্ডে যাচাই করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা উচিত।
একটি বিষয় স্পষ্ট—আমলাতন্ত্র যেমন দক্ষ, তেমনি রাজনৈতিক সংকট নিরসনে দক্ষতা তাদের নেই। অন্যদিকে রাজনৈতিক সামাজিক বিভক্ত বাস্তবতায় আমলা থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে সংকটকালে সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা কঠিন। তাই সরকার, বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে এমন একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা উচিত, যিনি রাজনৈতিকভাবে প্রজ্ঞাবান, আমলাতান্ত্রিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয়। কেবলমাত্র দলীয় স্বার্থ বা আমলাতান্ত্রিক সুবিধা নয়, জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেয়া সময়ের দাবি।


