ঘরের অশান্তি থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন যশোরের ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী জহির আলম (ছদ্মনাম)। মারাত্মক রোগ, এইচআইভি-এইডস-এ আক্রান্ত হয়ে শেষ হয়েছিল তার সেই চেষ্টা।
শৈশব আর কৈশোরে প্রায় প্রতিদিনই ঘরে বাবা-মায়ের মধ্যে ঝগড়া দেখতেন, যা তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া ছিলেন জহির।
কলেজে পড়ার সময় ১৬ বছর বয়সে আলম প্রায় নিয়মিতভাবে মাদক ইনজেকশন নেওয়া শুরু করেন। এতে সাময়িকভাবে স্বস্তি মিললেও এটি তার জীবন পাল্টে দেয়। জহির বলেন, ‘যখন বন্ধুদের সঙ্গে প্রথম ইনজেকশনের সুই ব্যবহার করি, তখন ভেবেছিলাম এটা শুধু জীবন থেকে দ্রুত পালানোর একটা উপায়।’
২০২৫ সালের প্রথম দিকে, কয়েক মাস ধরে জ্বর, ওজন কমা, বিভিন্ন গ্রন্থি ফুলে যাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যায় ভোগার পর চিকিৎসার খোঁজ করেন। ডাক্তারের দেওয়া নানা পরীক্ষার মধ্যে এইচআইভি পরীক্ষায় পজিটিভ নিশ্চিত হয়। অর্থাৎ তার এইডস হয়েছে। জহির এখন বিশ্বাস করেন, বহু বছর আগে ভাগাভাগি করা মাদকের সুইয়ের মাধ্যমেই তিনি সংক্রমিত হয়েছেন। তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে।
ডাক্তাররা অবিলম্বে তাকে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি দেওয়া শুরু করেন, যা এইডস আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্য স্থিতিশীল করার জন্য এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তার শারীরিক অবস্থা এখনো দুর্বল।
এখন নিজের জীবনকে নতুন করে গুছিয়ে তুলতে বদ্ধপরিকর জহির মাদক সেবন বন্ধ করেছেন। সতর্কতার সঙ্গে মেনে চলছেন ওষুধের রুটিন। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু বেঁচে থাকতে চাই এবং অন্যদেরকে সতর্ক করতে চাই যেন তারা একই ভুল না করেন।’
জহিরের অভিজ্ঞতাটি বড় একটি সংকটের একটি মাত্র অংশ। এইচআইভি সংকট এখন বড় শহরগুলোর বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে, যেসব এলাকাকে এক সময় মনে করা হতো কম ঝুঁকিপূর্ণ বা এইচআইভি-মুক্ত।
বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরে কম এইচআইভি বিস্তারের দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় একটি উদ্বেগজনক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর নতুনভাবে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা ছিল এক হাজার ৪৩৮, মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩২৬ জন। আগের বছর ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে এক হাজার ২৭৬ ও ২৬৬ জন।
গত মাসে সিরাজগঞ্জ জেলাকে এইচআইভি কেসের ‘রেড জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এখানকার অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি কেন্দ্রে (এআরটি) চলতি বছরের বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ২৫৫ জনের এইচআইভি-পজিটিভ শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে মারা গেছেন ২৬ জন।
এই জেলায় আক্রান্তদের ৭৩ শতাংশই ইনজেকশন ব্যবহারকারী মাদকাসক্ত। তাদের মধ্যে ২৯ জন শিক্ষার্থী এবং চারজন যৌনকর্মী।
সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের এআরটি কর্মসূচির ফোকাল পারসন ডা. শিমুল তালুকদার জানান, পাশের জেলাগুলো থেকেও রোগীরা সেখানে চিকিৎসা নিতে আসছেন, যা এইচআইভি সংক্রমণ অন্যান্য জেলাতেও ছড়িয়ে পড়ছে বলে ইঙ্গিত দেয়।
সিরাজগঞ্জের মতো যশোরেও এইচআইভি কেস বাড়ছে। জেলার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটিতে এই বছর ৫০টি এইচআইভি-পজিটিভ কেস রিপোর্ট করা হয়েছে, যার বেশিরভাগ রোগীই ১৭ থেকে ২৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালে ২৫টি কেসের মধ্যে শিক্ষার্থী ছিল মাত্র ১২ জন, তাদের মধ্যে মারা গেছেন ৫ জন। এই বছর আক্রান্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
এই বছরের ৫০টি নতুন কেসের মধ্যে ২৩ জন রোগী সমকামী বলে জানা গেছে, যা স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ বাড়ার আরেকটি কারণ।
যশোর জেলা হাসপাতালের এআরটি কেন্দ্রের প্রধান সমন্বয়ক ডা. কানিজ ফাতেমা সতর্ক করে বলেন, অসংযত ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রভাবে সমকামী সম্পর্কের প্রতি অনেকের মধ্যে কৌতূহল বাড়ছে। এতে তরুণদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এই প্রবণতাটি বিশেষভাবে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশি দেখা যাচ্ছে বলে জানান ডা. কানিজ ফাতেমা।
স্থানীয় চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে এইচআইভি কেসের প্রকৃত সংখ্যা রিপোর্ট করা সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি।
‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে ডা. শিমুল তালুকদার জানান, বর্তমান সংখ্যাগুলো কেবল হিমশৈলের চূড়া মাত্র। এর নিচে লুকিয়ে আছে আরও অনেক বড় সংখ্যা। কারণ, অনেক এইচআইভি কেস নির্ণয় ছাড়াই থেকে যাচ্ছে, যা ভাইরাসটিকে অলক্ষ্যে ছড়াতে দিচ্ছে।
তিনি আরও যোগ করেন যে, সামাজিক কলঙ্কের কারণে অনেকে এইচিআইভি সংক্রমনের কথা পরিবারকে জানাতে পারছেন না। ফলে তাদের জীবনসঙ্গী এবং আত্মীয়দের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ‘মানুষ এইডসের ভয়াবহতা বুঝতে পারছে না এবং ভাইরাস ছড়াচ্ছে’ বলে দুঃখ প্রকাশ করেন ডা. শিমুল তালুকদার। অথচ দ্রুত রোগ শনাক্ত করা গেলে এটি প্রতিরোধ সম্ভব বলে জানান তিনি।
দেশে এইচআইভি আক্রান্তদের শনাক্ত করতে না পারার একটি কারণ পরীক্ষা-সুবিধার অভাব। আরেকটি কারণ সচেতনতার অভাব এবং আক্রান্তদের মধ্যে জেনে বা না জেনে স্ক্রিনিং করতে না যাওয়া।
এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর উপদেষ্টা ডা. মোহাম্মদ মোশতাক হোসেন বলেন, প্রতিটি জেলায় এইচআইভি পরীক্ষার কেন্দ্র স্থাপন করা উচিত। পাশাপাশি প্রাথমিক পর্যায়ে সংক্রমণ শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য নিয়মিত স্ক্রিনিং অপরিহার্য।
রাজশাহী এইচআইভি-এইডস-এর জন্য দুর্বল স্বাস্থ্যসেবার একটি উদাহরণ। রাজশাহী মেডিকেল কলেজে এইচআইভি পরীক্ষার সুবিধা নেই। এই রোগের কোনো চিকিৎসাও দেওয়া হয় না। ফলে রোগীরা চিকিৎসার জন্য বগুড়ায় যেতে বাধ্য হচ্ছে।
২০২৫ সালের প্রথম দশ মাসে রাজশাহীতে ২৮টি নতুন এইচআইভি কেস রিপোর্ট করা হয়েছে, যা দেশের সর্বোচ্চগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাদের মধ্যে ১৭ জন সমকামী, ১০ জন যৌনকর্মী এবং একজন রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছেন। এ বছর একজন রোগী মারা গেছেন।
এইচআইভি পজিটিভ রোগীদের চিকিৎসা না করার কারণ জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামিম আহমেদ জানান, আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য একটি আলাদা ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে। এটি তৈরি হলে রোগীরা এখানে চিকিৎসা নিতে পারবেন।
এই সংকট মোকাবিলায় ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত ভিত্তিতে সারা দেশে শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার সুবিধা বৃদ্ধি করা।
তিনি যোগ করেন, ‘রোগী এবং ডাক্তার উভয়েরই কখনো কখনো এইচআইভি, এসটিআই বা স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে বিব্রত বোধ করেন, সমস্যাটি গোপন রাখতে চান।’ তিনি বলেন, এই মানসিকতা থেকে তাদের বেরিয়ে আসা উচিত।
আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা বলেন, এইচআইভি সম্পর্কে সচেতনতা এবং আলোচনা স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়—সব স্তরের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানো উচিত। কারণ, এই বিষয়গুলো শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করলে উপলব্ধি, প্রতিরোধ এবং জনস্বাস্থ্য সচেতনতা জোরদার হতে পারে।
এইচআইভি পজিটিভ কেসের উদ্বেগজনক বৃদ্ধি সত্ত্বেও, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেয়নি।
তবে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তারা রোগটির বিস্তার রোধে পরীক্ষার সুবিধা বাড়াচ্ছেন। মানুষের মধ্যে সচেতনতাও বাড়ানো হচ্ছে।


