আগামী ডিসেম্বরে ভারত থেকে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন বলে জানিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ সভাপতি জানান, তার দলের জ্যেষ্ঠ নেতারাও দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান।
গত ২৩ মে ‘হাসিনা বিচারের মুখোমুখি হতে চান’ শিরোনামে টাইমস অব বাংলাদেশ-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন শেখ হাসিনা।
সে সময় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এএফএম বাহাউদ্দিন নাছিম জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ একটি ‘বৃহৎ সমাবেশ’ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, নেত্রীর প্রত্যাবর্তন হবে ‘বীরোচিতভাবে’।
দলীয় অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো তখন জানিয়েছিল, কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল হওয়ায় শেখ হাসিনা নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ভ্রমণ অনুমতিপত্র নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘ফিরলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি হত্যাও করতে পারে। তবুও আমাকে যেতে হবে।’
সব ঝুঁকি সত্ত্বেও নিজের বাবা-মায়ের কবর যেখানে রয়েছে, সেই দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষার কথা জানান তিনি।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দেশত্যাগের বিষয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে সময় তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, কারণ ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সময় জনতা তার বাসভবনের দিকে এগিয়ে আসায় তার জীবনের ওপর হুমকি তৈরি হয়েছিল।
বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে চলমান বিচারপ্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ডের রায়কে ‘প্রহসন’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
‘দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করলে জনগণের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। কারাবরণ নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন নই’- বলেন তিনি।
১৯৮১ ও ২০০৭ সালে গ্রেপ্তারের অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। জানান, আইনি চাপের মধ্যেও কখন বা কীভাবে দেশে ফিরবেন- এ বিষয়ে কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে তিনি পরামর্শ করেননি।
আওয়ামী লীগ সভাপতির দেশে ফেরার সম্ভাবনাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেখছে বিএনপি সরকার।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, এটি একটি বিপজ্জনক ‘রাজনৈতিক ফাঁদ’, যার উদ্দেশ্য কেবল দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা একটি ‘পরিকল্পিত কৌশল’, যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনরায় সক্রিয় করা এবং রাজপথে বিক্ষোভ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা, সম্ভাব্য আপিলের পরও যদি সুপ্রিম কোর্ট তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে, তাহলে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ‘নৈরাজ্য’ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা এই নেত্রীর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বর্তমান সরকারের স্থিতিশীলতার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে বিদ্যমান টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্কেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ বারবার শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়ে আসছে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিষয়টি তারা পর্যালোচনা করছে এবং দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
শেখ হাসিনা জানান, তিনি বর্তমানে অনলাইন বৈঠকের মাধ্যমে দল পরিচালনা করছেন। দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তিনি এসব বৈঠক করেছেন।
তিনি বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল থাকলে হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না।’ তবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি খারাপ কিছু করে থাকি, তাহলে জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে।’
দীর্ঘদিনের শাসনামলে ‘ভুল হতে পারে’ বলেও মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। তবে কোনো সরকারের চূড়ান্ত বিচার করার অধিকার কেবল জনগণের বলেই মনে করেন তিনি।
প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন শেখ হাসিনা। স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ায় তিনি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন।
দীর্ঘ ২০ বছরের শাসনামলে দেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর কৃতিত্ব দেওয়া হলেও তার সরকারের বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমন করার অভিযোগও রয়েছে।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিকে নিয়ে যাওয়া ছাত্রআন্দোলনে সহিংসতায় প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন।


