শিকারিদের পাতা ফাঁদে আহত হয়ে উদ্ধার হওয়া একটি রয়েল বেঙ্গল বাঘিনী ছয় মাসের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পর আবারও ফিরেছে নিজের আবাসস্থল সুন্দরবনে।
রোববার দুপুরে সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলে বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করা হয়। বন বিভাগ জানিয়েছে, চিকিৎসা শেষে বনের বাইরে থেকে কোনো বাঘকে সুস্থ করে আবার সুন্দরবনে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম।
রোববার সকাল ৮টার দিকে মংলা ফুয়েল জেটি থেকে বন বিভাগের ট্রলারে করে বাঘিনীটিকে সুন্দরবনের উদ্দেশে নেওয়া হয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ট্রলারটি আন্ধারমানিক টহল ফাঁড়ি সংলগ্ন আন্দারিয়া খালে পৌঁছায়।
দুপুর ১২টার দিকে খাঁচার দরজা খুলে দেওয়া হলেও বাঘিনীটি প্রথমে বের হতে চায়নি। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর ট্রলারটি বনের আরও কাছাকাছি নেওয়া হয় এবং খাঁচার এক পাশ উঁচু করে দিলে বাঘিনীটি এক লাফে বনের ভেতরে ঢুকে মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে যায়।
অবমুক্তকরণ অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী, খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ রেজাউল করিম চৌধুরী, বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল এবং চিকিৎসায় নিয়োজিত বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান ভেটেরিনারি সার্জন আনিসুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

বন বিভাগ জানায়, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকির খালের কাছে হরিণ শিকারিদের পাতা ছিটকা ফাঁদে প্রায় ৯ ফুট লম্বা ও ৯০ কেজি ওজনের বাঘিনীটি আটকা পড়ে। পরদিন ট্রাঙ্কুলাইজার প্রয়োগ করে উদ্ধারের পর খুলনার বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়।
গাজীপুর সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন হাতেম সাজ্জাত মো. জুলকারনাইন বলেন, বাঘিনীটির পায়ে গভীর ক্ষত ছিল এবং শরীরেও নানা জটিলতা দেখা দিয়েছিল। শুরুতে খাবার না খাওায় ধাপে ধাপে চিকিৎসা ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে তাকে সুস্থ করে তোলা হয়। প্রথমে কলিজা ও ছোট ছোট মাংসের টুকরা, পরে ছোট প্রাণী এবং শেষে ছাগল ও শুকরের মাংস খাওয়ানো হয়। দীর্ঘ ছয় মাসের পরিচর্যায় বাঘিনীটি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের ডিএফও মোহাম্মদ রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘বাঘ উদ্ধার থেকে শুরু করে সুস্থ করে আবার বনে ফিরিয়ে দেওয়া, পুরো প্রক্রিয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। হাজারো মানুষের ভিড় সামলে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছে। বন বিভাগের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।’
প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, বাঘিনীটি এখন প্রাকৃতিক পরিবেশে নিজেই শিকার করে বেঁচে থাকবে। তার চলাচল ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে প্রায় ৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২০টি অত্যাধুনিক ক্যামেরা ট্র্যাপ বসানো হবে। এছাড়া আগামী এক বছর চারটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ দল বাঘিনীটির গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘বন্যেরা বনে সুন্দর। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বন বিভাগের সদস্যরা বাঘিনীটিকে সুস্থ করে তার প্রাকৃতিক আবাসে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। এটি বন বিভাগের জন্য একটি মাইলফলক এবং সুন্দরবন সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।’


