জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি খুব শিগগিরই বিলুপ্ত করে একটি নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে বলে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপির এই ছাত্রসংগঠনের আগামী কমিটিতে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী, নিঃস্বার্থ নেতা এবং রাজপথে পরীক্ষিত সংগঠকরা অগ্রাধিকার পেতে যাচ্ছেন। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রত্যাশার আলোকেই মূলত এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
ইতিমধ্যেই ‘সুপার ফাইভ’ পদের জন্য এক ডজনেরও বেশি প্রত্যাশীর অতীত রেকর্ড খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়েছে। বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা এ সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন বিএনপির হাইকমান্ডের কাছে জমা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এই বিশেষ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় মূলত পদপ্রত্যাশী কোনো নেতার সঙ্গে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কোনো যোগাযোগ রয়েছে কি না, কিংবা তারা চাঁদাবাজি বা অন্য কোনো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন কি না সেসব দেখা হচ্ছে। এর বিপরীতে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা, রাজনৈতিক মামলার মুখোমুখি হওয়া, কারাবরণ এবং সাংগঠনিক দক্ষতার মতো বিষয়গুলোকে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত ছাত্রদলের আগামী কমিটিতে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও ‘সুপার ফাইভ’-এর মতো শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান দেওয়া হতে পারে বলে সূত্রগুলো জানায়।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অসামান্য ভূমিকা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমান্বয়িক সম্প্রসারণ এবং গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের ব্যর্থতার বিষয়টি বিবেচনা করেই বিএনপি এই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে তুলনামূলকভাবে সক্রিয় ও তরুণ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে নিয়ে আসার জন্য ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের অনার্স এবং এর পরবর্তী সেশনগুলোকে বিশেষ বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। এই সেশনের অগ্রাধিকার বহাল থাকলে ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট পদপ্রত্যাশী তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে পিছিয়ে পড়তে পারেন।
বর্তমান সভাপতি রকিবুল ইসলাম রকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসিরের নেতৃত্বাধীন কমিটির দুই বছরের মেয়াদ গত ১ মার্চ শেষ হয়েছে। এর পর থেকেই নতুন নেতৃত্ব ও কমিটি গঠন নিয়ে বিএনপি, ছাত্রদল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়।
নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক নাসির টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, নতুন কমিটি গঠনের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ছাত্রদলের অভিভাবক বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর নির্ভর করছে, এটি পুরোপুরি তারই এখতিয়ার।
পদপ্রত্যাশী অন্য শিক্ষার্থী নেতারাও জানান, পদের জন্য আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তারেক রহমানের যেকোনো সিদ্ধান্ত তারা সানন্দে মেনে নেবেন।
ছাত্রদলের ‘সুপার টু বা সুপার ফাইভ’ পদের জন্য বর্তমানে যাদের নাম ব্যাপকভাবে আলোচনায় রয়েছে, তাদের মধ্যে আছেন—সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া, সহ-সভাপতি ইজ্জাজুল কবির রুয়েল, মনজুরুল আলম রিয়াদ, কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেত, খোরশেদ আলম সোহেল, তৌহিদুর রহমান আওয়াল ও ইব্রাহিম খলিল, সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল ইসলাম জিসান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ, গাজী মো. সাদ্দাম হোসেন, সালেহ মো. আদনান, মোস্তাফিজুর রহমান, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, প্রচার সম্পাদক শরিফ প্রধান শুভ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এম রাজিবুল ইসলাম তালুকদার বিন্দু।
এই পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াহইয়া দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদলের বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে কাজ করেছেন। ২০২২ সালের ২৪ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ কর্মীদের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং ২০২৩ সালে বিএনপির ঘোষিত অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে গাবতলী থেকে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন। ২৮ অক্টোবরের পর বিএনপির হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে তার নেতৃত্বে ঢাকা মহানগর উত্তর ও পশ্চিমে ছাত্রদলের প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ সম্পন্ন হয়।
কমিটি গঠনের বিষয়ে তিনি টাইমস’কে বলেন, কমিটি গঠন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের ওপর পাথরের মতো চেপে বসা ফ্যাসিবাদ দূর করতে এবং একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে বর্তমান কমিটি সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন কমিটির বিষয়ে আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। নতুন কমিটি যখনই গঠিত হোক না কেন, ছাত্রদল সাধারণ শিক্ষার্থীদের মুখপত্র হিসেবে আরও বেশি শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।’
অন্যতম পদপ্রত্যাশী ও কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ইজ্জাজুল কবির রুয়েল এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২৮ অক্টোবর-পরবর্তী আন্দোলনের সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তিনি বলেন, ‘সুপার টু বা সুপার ফাইভ’ সম্পূর্ণভাবে হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে এবং সাংগঠনিক অভিভাবকের সিদ্ধান্তই শেষ কথা।
এদিকে, সাংগঠনিক সম্পাদক আমান স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। আন্দোলন চলাকালে তিনি গ্রেপ্তার, কারাবরণ এবং রিমান্ডে চরম নির্যাতনের শিকার হন। নেতাকর্মীরা তাকে একজন ত্যাগী নেতা হিসেবে গণ্য করেন এবং বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারাও বারবার তার ত্যাগের কথা বলেছেন। তবে তার নামে কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগও ইতিমধ্যে সামনে এসেছে।
পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে রিয়াদ একটি রাজনৈতিক মামলায় দীর্ঘদিন কারাগারে কাটিয়েছেন। খোরশেদ আলম সোহেল সাতটি মামলায় কারাবরণ করেন এবং রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হন। তৌহিদুর রহমান আওয়াল রাজপথের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি আহত নেতাকর্মীদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে চিহ্নিত মোমিনুল ইসলাম জিসান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিক মামলা, হামলা ও কারাবরণের মুখোমুখি হয়েছেন।
তৃণমূল থেকে উঠে আসা ইব্রাহিম খলিল আন্দোলন চলাকালে বেশ কয়েকবার হামলার শিকার হন। শরিফ প্রধান শুভ ছাত্রলীগের হামলায় আহত হন, ছয় মাস কারাবরণ করেন এবং গণ-অভ্যুত্থানের শুরু থেকেই রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। কাজী জিয়াউদ্দিন বাসেতের বিরুদ্ধে নয়টি মামলা রয়েছে। পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে তিনি ১০ মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং পরে গুমের অভিযোগ ও অস্ত্র মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে গণেশ চন্দ্র রায় সাহস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। রাজপথে সক্রিয় ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে মোস্তাফিজুর রহমান, সালেহ মো. আদনান এবং মিনহাজ আহমেদ প্রিন্সও বর্তমানে শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছেন।
নতুন কমিটি নিয়ে তৌহিদুর রহমান আওয়াল টাইমস’কে বলেন, ‘ছাত্রদলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের ওপর শতভাগ আস্থা রাখেন এবং আমরা সবাই তার যেকোনো সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অবিচল।’
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, শেষ পর্যন্ত যদি ২০০৯-১০ অনার্স সেশন এবং তার পরবর্তী শিক্ষাবর্ষগুলোকে মূল শর্ত বা অগ্রাধিকার হিসেবে ধরা হয়, তবে অনেক হেভিওয়েট নেতাই রেস থেকে ছিটকে পড়তে পারেন। সেক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত কিন্তু সক্রিয় তরুণ প্রতিদ্বন্দ্বীরা শীর্ষ নেতৃত্বে চলে আসতে পারেন।


