ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশই পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ দাবি করেছে। তাদের এই পাল্টাপাল্টি দাবি ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলে।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, সোমবার হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রয়েছে বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে বলে দাবি করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, প্রণালিটি এখনো খোলা রয়েছে।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সোমবার ভোরে দেশটির ভূখণ্ডে সবশেষ হামলার খবর নিশ্চিত করেছে। তারা জানিয়েছে, কয়েকটি স্থানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে এবং এতে অন্তত একজন নিহত হয়েছে।
এদিন ভোরে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে ইরানি কুর্দি বিরোধী সংগঠন কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টির সশস্ত্র শাখার একটি ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। সংগঠনটির কুর্দিস্তান মিলিশিয়া কোরের কমান্ডার রেবাজ শরিফি জানিয়েছেন, তাদের চামশার ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। তবে হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য তিনি জানাননি। কোনো সংগঠন এ হামলার দায় স্বীকার করেনি।
গত রোববার ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালিতে একটি কনটেইনার জাহাজে ইরানের হামলার পর অঞ্চলটিতে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। সাম্প্রতিক এসব পাল্টাপাল্টি হামলাই ফের স্পষ্ট করেছে, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ অবসানের আলোচনায় সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পারস্য উপসাগরের সরু প্রবেশপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে একসময় বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ইরান তাদের নির্দেশিত পথের বাইরে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে এবং জাহাজ পরিচালনাকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে কার্যত প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বর্তমানে ৬০ দিনের একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির সময়সীমার প্রায় মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, তার কাছে এই যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’ হয়ে গেছে। এরপরও আনুষ্ঠানিকভাবে মধ্যস্থতাকারীরা কিংবা দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার ঘোষণা না দেওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে চলমান যুদ্ধবিরতি নড়বড়ে অবস্থায় টিকে আছে।
এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের জন্য আলোচনা শুরু করা। তবে এর পরিবর্তে পরিস্থিতি হরমুজ প্রণালি এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে ধারাবাহিক হামলায় রূপ নিয়েছে। বিশ্বনেতারা আশঙ্কা করছেন, ইরানের সঙ্গে ফের পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সোমবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণমাত্রার সংঘাতে ফিরে যাওয়া ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সোমবারের হামলায় তারা ইরানের কয়েক ডজন স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সরঞ্জাম এবং ছোট নৌযান।
এক বিবৃতিতে তারা দাবি করে, ‘হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। ইরান এর নিয়ন্ত্রণে নেই।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই বক্তব্য কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরানের আধাসামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি)। তারা বলছে, ‘হরমুজ প্রণালি আমাদের ভূখণ্ড। বিশ্বের অন্য প্রান্ত থেকে আসা একটি উগ্রবাহিনী ও শিশু হত্যাকারী বাহিনীকে এখানে অবৈধ হস্তক্ষেপ চালিয়ে যেতে দেওয়া হবে না।’
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও পাল্টা হামলা জোরদার করেছে তেহরান। সোমবার বাহরাইনে দুই দফা ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা সংকেত বাজানো হয়। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম বহরের ঘাঁটি রয়েছে। কুয়েত জানিয়েছে, তারা শত্রুপক্ষের ছোড়া হামলা প্রতিহত করছিল। তবে দুই দেশেই তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
এর আগে রোববারও বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, জর্ডান এমনকি ওমান পর্যন্ত ইরানের হামলা ছড়িয়ে পড়ে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে থাকা জলসীমার একটি অংশ ওমান ও ইরানের মধ্যে অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরে তেহরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা ওমান এই হামলার প্রতিবাদ জানাতে ইরানি কূটনীতিককে তলব করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী রোববার ভোরে জানিয়েছিল, তারা তেহরানের প্রায় ১৪০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ছিল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, অস্ত্রের গুদাম, যোগাযোগ সরঞ্জামসহ বিভিন্ন স্থাপনা। গত এক সপ্তাহে চালানো আগের দুই দফা হামলার তুলনায় এটি ছিল অনেক বড় আকারের অভিযান।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা গত রাতে তাদের ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়েছি।’
জবাবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও দেশটির অন্যতম প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘একতরফা চুক্তির যুগ শেষ। আমরা বলেছি, নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করুন, না হলে মূল্য দিতে হবে। বাস্তবতা এখন দরজায় কড়া নাড়ছে।’


