হাঁটুপানি ভেঙে আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছিলেন বাঁশখালীর আসিফ হোসেন। তিন দিন ঘরবাড়ি ডুবে থাকায় খাওয়ার পানি নেই, তাই এক কিলোমিটার দূর থেকে মা-বাবার জন্য পানি আনছেন তিনি। সঙ্গী কিশোর মকিমও একই কাজ করছে। টানা দুই দিন ধরে শুকনো খাবার ছাড়া কোনো ত্রাণ মেলেনি বলে তাদের অভিযোগ।
বন্যাকবলিত সাত জেলার লাখো মানুষের এখন এমনই করুণ দশা। বিশুদ্ধ পানির সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোগবালাই আর ত্রাণের হাহাকার।
দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব এলাকার এই বন্যার পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাতেও ভারী বর্ষণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত টানা বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা। জলাবদ্ধ এলাকায় বিকল হয়ে পড়ে যানবাহন। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন অফিস ও স্কুল-কলেজগামী মানুষ।
৪ জুলাই থেকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়েছে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের অন্তত ৫৮টি উপজেলা।
দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের ১২ জুলাইয়ের হিসাবে, বন্যায় ৫১ জনের মৃত্যু, ৩৯ জন আহত এবং ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন মানুষ।
গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১ হাজার ১৬৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। রোববার বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সাঙ্গু, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর কয়েকটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে, তবে তিস্তা অববাহিকা ও উত্তরাঞ্চলে নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত দেশের ১২৭টি নদী পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে ৬৬টিতে পানি বেড়েছে, ৬০টিতে কমেছে।
পানি নামলেই শুরু রোগবালাই
পানি কমার সঙ্গে সঙ্গেই পানিবাহিত রোগের শঙ্কা বাড়ছে। মৌলভীবাজারের মনু ও ধলাই নদীর পানি কমলেও ডায়রিয়া, জ্বর ও অ্যালার্জি দেখা দিচ্ছে। রাজনগরের কামারচাক ইউনিয়নের বাসিন্দারা জ্বর ও ডায়রিয়ায় ভুগছেন।
জেলা সিভিল সার্জন মো. মামুনুর রহমান জানান, পানিবাহিত রোগের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত ওষুধসহ মেডিকেল টিম প্রস্তুত রয়েছে।
চট্টগ্রামে ৭৫ জন সাপে কাটা এবং ২৫ জন পানিবাহিত রোগী শনাক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম। কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরীতে ৫৪টি মেডিকেল টিম ও র্যাপিড রেসপন্স টিম কাজ করছে বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. জয়নাল আবেদীন।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সাত দফা নির্দেশনা দিয়ে চিকিৎসক-নার্সদের ছুটি বাতিল করেছে। ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন পর্যাপ্ত ওষুধ মজুত ও আগাম প্রস্তুতির কথা জানালেও, বাস্তবে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকট চলছে।
বিশুদ্ধ পানি আর খাবারের হাহাকার
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পূর্ব ইলশা আশ্রয়কেন্দ্রের ১২টি পরিবার এখনো খাদ্য সহায়তা পায়নি। স্থানীয় বাসিন্দা মনোয়ার জামান জানান, জমানো চাল-আলু শেষ, এখন মুড়ি খেয়ে দিন পার করছেন।
তবে বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রুহুল আমিন জানান, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪৪ টন চাল ও শুকনো খাবার বিতরণ হয়েছে।
সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর প্রায় আট লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পানিবন্দী। কাকারার বাসিন্দা মো. জমিল জানান, চার দিন ধরে চুলা জ্বলছে না। চকরিয়ার বাসিন্দা নুরুদ্দিনের অভিযোগ, শিশুদের খাবার মিলছে না।
বাঁশখালীতে বিশুদ্ধ পানি সংকটে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন পানিবন্দী মানুষ। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনছেন তারা।
কক্সবাজারের ২৫টি ইউনিয়ন ও দুই পৌরসভাসহ পুরো জেলায় চরম কষ্টে আছেন সাড়ে চার লাখ মানুষ। নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় বেশিরভাগেরই রান্নার উপায় নেই। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান ১২০ টন চাল ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দিয়ে নিজেই ত্রাণ বিতরণ করেছেন।
দুর্গম পাহাড়ে পৌঁছায় না ত্রাণ
সারা দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বান্দরবান। সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানান, জেলার সব যান চলাচল বন্ধ। বাজালিয়ায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় দূরপাল্লার বাসও চলছে না। রাঙ্গুনিয়ার পদুয়ায় সেতু ধসে রাঙ্গামাটি-বান্দরবান সড়ক যোগাযোগ বন্ধ। লিচুবাগান ফেরি সার্ভিস বন্ধ থাকায় বিকল্প পথও নেই।
রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জাকির হোসেন জানান, রাইখ্যং নদীর প্রবল স্রোত ও উদয়চরে সড়ক ধসে পড়ায় ফারুয়া ইউনিয়নের ২৫ হাজার পানিবন্দী মানুষের কাছে ত্রাণ পাঠানো যাচ্ছে না। তবে স্থানীয়ভাবে ত্রাণ সংগ্রহ করে দেওয়া হচ্ছে।
জেলার পুঁইছড়ি, শেখেরখীল, ছনুয়া, সরল, গণ্ডামারা, বড়গুনা, পশ্চিম চাম্বল, টিপুটিগুনা এলাকার বিপন্ন মানুষ এখনো কোনো ত্রাণ পাননি।
খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালায় পানি নামলেও কাদা ও জলাবদ্ধতার কারণে মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন, যা রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
যেখানে উন্নতি, সেখানেও ভোগান্তির রেশ
সিলেট বিভাগের নদ-নদীর পানি কিছুটা কমেছে। হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও নিম্নাঞ্চলের ৭০ হাজার মানুষ এখনো পানিবন্দী। মৌলভীবাজারের ত্রাণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানান, পানিবন্দী মানুষের সংখ্যা ২৬ হাজার ৫৪৪ জনে নেমে এসেছে। আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন ২ হাজার ১৭২ জন।
হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে ও নদীভাঙনে প্রায় ২৮ হাজার ১৪০ জন পানিবন্দী। জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, বানভাসিদের জন্য চাল, শুকনো খাবার ও নগদ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির অভাবে দুর্গতরা নতুন ভোগান্তিতে পড়ছেন।
ত্রাণের হিসাব বনাম মানুষের অভিযোগ
ত্রাণ মন্ত্রণালয় সাত জেলার জন্য ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং ২ হাজার ৬৫০ টন চাল বরাদ্দ দিলেও মাঠে ভিন্ন চিত্র। বাঁশখালীর মোহাম্মদ ইদ্রিসের অভিযোগ, উত্তর বাঁশখালীতে ত্রাণ পৌঁছালেও দক্ষিণে তেমন যায়নি। সিন্ডিকেটের কারণে ত্রাণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত ভুক্তভোগীরা। লক্ষ্যারচরের মানুষ এক সপ্তাহ ধরে ত্রাণ পাননি।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, ১ হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১২ হাজার মানুষ আছেন। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশে প্রায় চার লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দী। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘খাল দখল ও জলপ্রবাহে বাধার কারণেই এমন প্রকট জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।’
কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতাই কি দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের কারণ
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু বৃষ্টি নয়, কৃত্রিম বাধাই দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের মূল কারণ। চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তানজীর সাইফ আহমেদ জানান, প্রভাবশালীরা মাছ ও লবণের ঘের বাঁচাতে অবৈধ বাঁধ দিচ্ছে। একই সাথে তারা স্লুইসগেট বন্ধ রাখায় পানি নামতে পারছে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপার সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক আলাউদ্দিন আলো চকরিয়ায় কাঠের তক্তা দিয়ে স্লুইসগেট আটকে রাখার প্রমাণ পেয়েছেন। পেকুয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, অবৈধভাবে গেট বন্ধ রাখায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। প্রশাসন এগুলো কেটে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।
সামনে আরও দুর্যোগের শঙ্কা
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানান, শনিবার মনু, কুশিয়ারা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে ছিল। সহকারী প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল জিহান পূর্বাভাস দিয়ে বলেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় ফেনী, সিলেট ও তিস্তা অববাহিকাসহ বিভিন্ন জেলার নিম্নাঞ্চলে নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে।
সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ ও উজানে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে পানি যেখানে কমছে, সেখানে স্বস্তি কেবল সাময়িক, যেকোনো সময় পুরোনো দুর্ভোগ ফিরে আসার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।


