পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই অভিযুক্তদের ছাড় দিলে ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। এতে এমন বার্তা যাবে, ব্যাপক সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেও শেষ পর্যন্ত পার পাওয়া সম্ভব।
শনিবার রাজধানীর তোপখানা রোডের সিরডাপ মিলনায়তনে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ আয়োজিত ‘কনসালটেশন অন হিউম্যান রাইটস অ্যাবিউজেজ অ্যান্ড অ্যাকসেস টু জাস্টিস ফর ভিকটিমস’ শীর্ষক পরামর্শ সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের যেসব দেশে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, সেসব দেশেই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী বিচার প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা কেবল অতীতের অন্যায়ের প্রতিকার নয়, বরং ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখারও অন্যতম পূর্বশর্ত।
অধিকারের সভাপতি তাসনিম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সভায় বক্তব্য দেন।
আইনমন্ত্রী দেশে মৌলিক ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথে ভারতীয় আধিপত্যবাদসহ বিভিন্ন ধরনের আধিপত্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, নৈরাজ্যবাদ, ফ্যাসিবাদ ও মৌলবাদকে প্রধান অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করেন।
সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে আইনমন্ত্রী বলেন, বিচার বিভাগে অতীতে ফ্যাসিবাদী প্রভাবের কারণে গড়ে ওঠা কাঠামোর প্রভাব এখনো কাটিয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
নিম্ন আদালতের বিচারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা সীমিত বলেও দাবি করেন আইনমন্ত্রী।
তিনি বলেন, একজন সহকারী জজ বা বিচারককে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা আইন মন্ত্রণালয়ের নেই, মন্ত্রণালয় শুধু সুপারিশ করতে পারে। তার দাবি, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নিম্ন আদালতের প্রায় ১ হাজার ৪০০ বিচারককে বদলি করা হলেও বিতর্কিত কিছু বিচারকের পোস্টিং ঠেকাতে সরকারের উদ্যোগের প্রায় ৭০ শতাংশই সুপ্রিম কোর্ট থেকে অনুমোদন পায়নি।
এ সময় বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, কিন্তু যদি কোনো আইন মানুষের যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা একটি অকেজো বিষয়ে পরিণত হয়।
মাহমুদুর রহমান বলেন, দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার চেয়েও বিচারপতিদের দায় বেশি ছিল। বিচার বিভাগই এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিল, যার ওপর ভর করে দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পরেই ফ্যাসিস্ট আমলের বিচারকদের অপসারণ করা উচিত ছিল।
‘হিউম্যান রাইটস সিচুয়েশন: স্টেট রেসপনসিবিলিটি, অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড জাস্টিস’ শীর্ষক দ্বিতীয় অধিবেশনে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও সাংবাদিক আকবর হোসেন।
তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই-আগস্টে সারা দেশে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গুমের ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার জনবল ও অবকাঠামো পর্যাপ্ত নয়।
জুলাই-আগস্টে ৬১টি জেলায় সংঘটিত অপরাধ এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত গুমের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, তথ্য উদ্ঘাটন ও জনসম্মুখে তুলে ধরতে আরও বড় পরিসরের জনবল প্রয়োজন।
তিনি ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোরও ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এ উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি, যদিও তা সময়ের দাবি। তার ভাষ্য, বিদ্যমান ট্রাইব্যুনাল ও তদন্ত সংস্থার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে বিচার প্রক্রিয়ার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে গেছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি।
তাজুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রমে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষ্য, বর্তমানে যেসব সাক্ষী সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তব উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি বলেন, সাক্ষীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ভয়াবহ অপরাধের ঘটনায় কেউ সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসবেন না। এতে বিচার প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে এবং কার্যত ন্যায়বিচারের পথ সংকুচিত হয়ে পড়বে।
আকবর হোসেন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও বিচ্ছিন্নভাবে সহিংসতার কিছু অভিযোগ রয়েছে। তার মতে, মব ভায়োলেন্স শব্দটি সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এলেও গণপিটুনির ঘটনা দেশে নতুন নয়।
তিনি বলেন, বিশ্বের কোনো দেশেই শতভাগ মানবাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে কোনো সরকার যদি যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকার মানসিকতা গ্রহণ করে, তখন দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রবণতা বাড়ে। অন্যদিকে নিয়মিত নির্বাচন এবং জনগণের কাছে জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা থাকলে সরকারের জবাবদিহি ও মানবাধিকার সুরক্ষার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ মডেলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি পুনর্মিলনের পক্ষে। তবে তার মতে, যে রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে অনুশোচনা বা জবাবদিহির কোনো প্রকাশ না থাকলে কার্যকর পুনর্মিলনের ভিত্তি তৈরি হয় না।
রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার প্রসঙ্গ তুলে আকবর হোসেন বলেন, সেখানে সহিংসতার জন্য উসকানি দেওয়ার অভিযোগে একজন সাংবাদিক ও রেডিও উপস্থাপককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যদিও তিনি নিজে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি। তার মতে, গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধে ঘৃণা ও সহিংসতায় উসকানিকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদনের গুরুত্বের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।


