দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিএনপি মনোনয়ন দেওয়ায় তিনি পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে চলেছেন। সংসদে দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তার জয় এখন আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।
বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোয় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সংযত বক্তব্য এবং সংলাপের পক্ষে অবস্থানের কারণে অনেকেই আশা করছেন, তিনি মূলত আনুষ্ঠানিক এই পদটিকে আরও কার্যকর ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলতে পারেন।
বিএনপির সিদ্ধান্তের পর দলটির নেতাদের পাশাপাশি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যেও আলোচনা শুরু হয়েছে—ফখরুলের নেতৃত্বের ধরন রাষ্ট্রপতি পদে আরও সক্রিয় ভূমিকার নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে কি না।
প্রায় ছয় দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, সংযত বক্তব্য, রাজনৈতিক সমঝোতার পক্ষে অবস্থান এবং তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে বিএনপির ভেতরে ও বাইরে অনেকেই মনে করছেন, তার মনোনয়ন রাষ্ট্রপতি পদে ভিন্ন ধরনের ভূমিকা পালনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, রাষ্ট্রপতি একটি সাংবিধানিক পদ এবং দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এ দায়িত্ব পালন করতে হয়।
তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদ একটি সাংবিধানিক পদ। সব দল ও মতের ঊর্ধ্বে উঠে এই দায়িত্ব পালন করতে হয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। এ কারণেই বিএনপি তাকে মনোনয়ন দিয়েছে। দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এই সিদ্ধান্তে খুশি। আমরা আশা করি, তিনি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশ, দেশের মানুষ ও তাদের কল্যাণে কাজ করবেন।’
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।
সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে নির্ধারণ করলেও নির্বাহী ক্ষমতা মূলত প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত। সংবিধানের ৪৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ওপরে রাষ্ট্রপতির মর্যাদা। তবে ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতি তার অন্যান্য কার্যাবলি পালনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন।
এর অর্থ হলো, সংসদ আহ্বান, অধিবেশন স্থগিত ও সংসদ ভেঙে দেওয়া, বিলে সম্মতি দেওয়া, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, যুদ্ধ ঘোষণা, শান্তিচুক্তি অনুমোদন এবং ক্ষমা প্রদর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও রাষ্ট্রপতিকে সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসরণ করতে হয়।
সংবিধানে আরও বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে কোনো পরামর্শ দিয়েছেন কি না এবং দিয়ে থাকলে সেই পরামর্শের বিষয়বস্তু কী ছিল—তা নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না।
ফলে রাষ্ট্রপতির স্বাধীন সাংবিধানিক ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। রাষ্ট্রপতি তার দায়িত্ব পালনকালে সরকারি কর্মকাণ্ডের জন্য বিশেষ দায়মুক্তিও ভোগ করেন। মেয়াদকালে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম শুরু করা বা গ্রেপ্তারের জন্য আদালতের প্রক্রিয়া জারি করা যায় না।
তবে জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বেশ কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংসদের উভয় কক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনসহ কয়েকটি সাংবিধানিক ও আইনসৃষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা দেওয়া।
এ ছাড়া রাষ্ট্রদ্রোহ, গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে এসব প্রস্তাব এখনো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। প্রস্তাবিত কিছু নিয়োগ ক্ষমতা নিয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে। জুলাই সনদের অধীনে সাংবিধানিক সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিতে সংসদ একটি বিশেষ কমিটিও গঠন করেছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বর্তমান সংবিধানের অধীনে রাষ্ট্রপতির স্বাধীন ক্ষমতা খুবই সীমিত।
তিনি বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী দুটি বিষয় ছাড়া প্রধানমন্ত্রী ছাড়া রাষ্ট্রপতির নিজের ইচ্ছায় কিছু করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতি মূলত একটি আলংকারিক পদ।’
তবে ফখরুল চাইলে নীতি প্রণয়ন ও বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মনে করেন তিনি।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘একজন জ্যেষ্ঠ ও জনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে ফখরুল ইসলাম আলমগীর জননীতির বিষয়ে কথা বলতে এবং পরামর্শ দিতে পারেন। সেই পরামর্শ আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—দুইভাবেই দেওয়া সম্ভব। তবে সেই পরামর্শ গ্রহণ করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।’
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, সংসদে প্রকাশ্য ভোট এবং ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সাধারণত অনুমেয় হয়ে থাকে। বিরোধী দলের প্রার্থীরা খুব কম ক্ষেত্রেই নির্বাচনে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেন।
এবার সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়াও অনেকটাই নিশ্চিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফখরুলের সংযত রাজনৈতিক ধরন, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং জনপরিসরে তার ভাবমূর্তি রাষ্ট্রপতি পদটির বাস্তব গুরুত্ব বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
তবে তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সব নাগরিকের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা এবং একই সঙ্গে সংবিধানের নির্ধারিত সীমার মধ্যে থেকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।


