চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সৈকতে নিখোঁজ হওয়ার তিনদিন পর মুফিদ আহমেদ শাওন (১৪) নামের এক স্কুলছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় শাওনের চার বন্ধুকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।
গত শনিবার স্কুলে পরীক্ষা শেষে বন্ধুদের সঙ্গে পতেঙ্গা সৈকতে যায় শাওন। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। সোমবার পতেঙ্গা থানা-পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে একটি লাশ উদ্ধার করে। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা লাশটি শাওনের বলে শনাক্ত করেন। ওই দিন রাতেই লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
শাওনের পরিবারের দাবি, এটি নিছক পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা নয়; পরিকল্পিতভাবে শাওনকে হত্যা করা হয়েছে।
শাওন হালিশহরের চট্টগ্রাম মডার্ন স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরিবারের সঙ্গে চট্টগ্রামের চুনা ফ্যাক্টরি এলাকায় থাকত সে। তাদের আদি বাড়ি সন্দ্বীপে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার শাওনের স্কুলে পরীক্ষা ছিল। দুই ঘণ্টার পরীক্ষায় এক ঘণ্টা পরই সে খাতা জমা দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে পতেঙ্গা সৈকতে চলে যায়। সাধারণত পরীক্ষা শেষে এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে শাওন বাসায় ফিরে আসত। ফুটবল খেলার প্রতি তার বেশ আগ্রহ ছিল।
কিন্তু সেদিন বিকাল গড়িয়ে গেলেও শাওন বাসায় ফেরেনি। বিকাল তিনটার পর থেকে তার মুঠোফোনেও যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।
শাওনের বাবা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘একটু দেরি হলেও শাওন ফোন করে জানাত। কিন্তু সেদিন বিকাল তিনটার পর থেকে তার কোনো ফোন পাইনি। তার মা বারবার আমাকে ছেলেকে খুঁজতে বলছিল।’
এরপর ছেলের খোঁজে প্রথমে শাওনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইদকানের বাসায় যান তার বাবা। সেখানে কোনো তথ্য না পেয়ে ইদকানের বাবার সহপাঠী ও হালিশহর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জিহাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি।
শাওনের পরিবার আরও জানায়, ওই রাত সাড়ে ১০টার দিকে কয়েকজন বন্ধুকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তখন তারা শাওন সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী তথ্য দিতে থাকে। প্রথমে তারা দাবি করে, সবাই একসঙ্গে পতেঙ্গা থেকে ফিরেছে এবং শাওনকে বি ব্লক ব্রিজের পাশে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে সাব্বির নামের আরেক বন্ধুও একই ধরনের তথ্য দেয়।
কিন্তু এসব তথ্যের কোনোটি যাচাই করে শাওনের সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে ওই রাতেই হালিশহর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে পরিবার।
পরিবারের দাবি, পরবর্তী সময়ে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে বন্ধুদের বক্তব্যে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসে। প্রত্যক্ষদর্শীদের সামনেও তারা ঘটনার বর্ণনা দেয়।
পুলিশের কাছে দেওয়া বন্ধুদের বক্তব্যের বরাত দিয়ে পরিবার জানায়, শাওনসহ তারা সবাই সাগরের পানিতে নেমেছিল। একপর্যায়ে ঢেউয়ের তোড়ে শাওন পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করে। বন্ধুরা তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেও ওপরে তুলতে পারেনি। একপর্যায়ে তারা শাওনকে ছেড়ে দেয়। পরে সাগরে ভেসে যায় শাওন। এরপর শাওনের স্কুলব্যাগটিও সাগরে ফেলে দিয়ে বন্ধুরা বাড়ি ফিরে যায়।
পরিবারটি আরও দাবি করেছে, ঘটনাটি সঙ্গে সঙ্গে পরিবার বা পুলিশকে না জানিয়ে গোপন রাখার কারণ জানতে চাইলে শাওনের বন্ধুরা আইনি ঝামেলা এড়াতেই বিষয়টি গোপন রেখেছিল বলে জানিয়েছে।
পতেঙ্গা থানা-পুলিশ গত সোমবার অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে শাওনের লাশ উদ্ধার করে। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় লাশটি আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফনের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছিল। পরে চমেক হাসপাতালের মর্গে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা লাশটি শনাক্ত করেন। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এ ঘটনায় হালিশহর থানায় শাওনের চার বন্ধুকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে।
হালিশহর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মো. সুলতান আহসান উদ্দিন বলেন, ‘মামলার চার আসামিকেই গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
শাওনের পরিবার ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে মনে করছেন।
শাওনের বাবা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ওরা যদি সত্যিই শাওনকে বাঁচানোর চেষ্টা করত, তাহলে বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জানাত। হাত ধরে টেনে তুলতে পারেনি, অথচ স্কুলব্যাগ সাগরে ফেলে দিয়েছে- এতে আমাদের সন্দেহ আরও বেড়েছে।আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
তবে শাওনের মৃত্যু দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে- তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।


