সাগরে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মহেশখালী টার্মিনালে এলএনজিবাহী জাহাজ ভিড়তে না পারায় চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এতে বন্দরনগরীতে গ্যাসসংকট আরও তীব্র হয়েছে।
মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে সম্মিলিত স্বাভাবিক ক্ষমতার অর্ধেকের কিছুটা বেশি হয়েছে। এতে বর্তমানে দৈনিক চাহিদার মাত্র ৪৫ শতাংশের মতো গ্যাস পাচ্ছে চট্টগ্রাম জেলা।
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকার বাসাবাড়ি, সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও শিল্পকারখানায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগ কমাতে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সাময়িকভাবে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ কমানো শুরু করেছে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, মহেশখালীর দুটি টার্মিনাল থেকে বুধবার জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিনের মতো প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জি টার্মিনাল থেকে ৩০০ এমএমসিএফডি এবং সামিট এলএনজি থেকে প্রায় ১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল।
নাসির উদ্দিন জানান, সামিট টার্মিনালে পণ্য খালাসের জন্য একটি এলএনজিবাহী জাহাজ প্রস্তুত ছিল। তবে সাগরে খারাপ আবহাওয়ার কারণে সেটি টার্মিনালে ভেড়ানো সম্ভব হয়নি। আবহাওয়ার উন্নতি হলে কার্গো থেকে এলএনজি খালাস করা যাবে। তখন সামিট টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহও বাড়বে।
অন্যদিকে এক্সিলারেট এনার্জি টার্মিনালও মেরামতের কারণে পূর্ণ ক্ষমতায় চলছে না। গ্যাস পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার জন্য প্রয়োজনীয় দুটি বয়লারের মধ্যে বর্তমানে একটি চালু আছে।
আরপিজিসিএল সূত্র জানায়, একটি বয়লার দিয়ে টার্মিনালটি দিনে প্রায় ৩০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করতে পারে। দ্বিতীয় বয়লার চালু হলে সরবরাহ আরও ৩০০ এমএমসিএফডি বাড়বে। তখন টার্মিনালটি তার পূর্ণ ক্ষমতা ৬০০ এমএমসিএফডিতে পৌঁছাতে পারবে।
মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ ক্ষমতা দিনে ১ হাজার ১০০ এমএমসিএফডি। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির ক্ষমতা ৬০০ এমএমসিএফডি এবং সামিট এলএনজির সর্বোচ্চ ক্ষমতা ৫০০ এমএমসিএফডি।
নাসির উদ্দিন আরও জানান, বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজি সাধারণত জমিয়ে রাখার সুযোগ নেই। জাহাজ আসার পর তা খালাস করে সরাসরি সরবরাহ ব্যবস্থায় পাঠানো হয়। আবহাওয়া অনুকূলে এলে নতুন এলএনজি খালাস করা সম্ভব হবে। তখন দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামে। পুরো অঞ্চলটি গ্যাস সরবরাহের জন্য মূলত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল সেবা বিভাগ) তাজউদ্দিন ঢালী জানান, বুধবার সকালে কোম্পানিটি জাতীয় গ্রিড থেকে মাত্র ২১০ এমএমসিএফডি গ্যাস পেয়েছিল। দুপুরে তা আরও কমে ১৯২ থেকে ১৯৪ এমএমসিএফডিতে দাঁড়ায়।
তিনি জানান, গত ২১ জুলাই সামিট এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর বড় ধরনের বিপর্যয় শুরু হওয়ার আগে কেজিডিসিএল এলাকায় স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২৪০ এমএমসিএফডি। পরে রুটিন মেরামতের পর সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও তা চাহিদার তুলনায় কম ছিল। গত ১১ আগস্ট সরবরাহ ছিল ২০০ থেকে ২৩৫ এমএমসিএফডির মধ্যে। বুধবারের নতুন সংকট গ্যাস বণ্টন ব্যবস্থার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করেছে।
বাসাবাড়ি ও সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে সংযোগ সচল রাখতে কেজিডিসিএল কিছু শিল্প গ্রাহকের গ্যাস সরবরাহ কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। তাজউদ্দিন ঢালী বলেন, আবাসিক গ্রাহকরা যাতে চরম দুর্ভোগে না পড়েন, সেজন্য সাময়িকভাবে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, স্বাভাবিক সরবরাহে ফেরার বিষয়টি মহেশখালীতে এলএনজি খালাস ও জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে আগামী শনিবারের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
কেজিডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে প্রতিদিন গ্যাসের মোট চাহিদা ৩১২ থেকে ৩৫০ এমএমসিএফডি। এর মধ্যে সার কারখানায় লাগে ৯০ থেকে ১০০ এমএমসিএফডি, বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় ৪০ এমএমসিএফডি এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনে প্রায় ১৯ এমএমসিএফডি গ্যাস। বাকি গ্যাস আবাসিক, বাণিজ্যিক ও অন্যান্য শিল্প গ্রাহকদের সরবরাহ করা হয়। এসব শিল্পের মধ্যে রয়েছে ইস্পাত, কাঁচ, সিমেন্ট, জাহাজ ভাঙা, ঢেউটিন ও পোশাক কারখানা।
নতুন করে গ্যাসের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় এরই মধ্যে সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদনে চলা কারখানাগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বাসাবাড়ির গ্রাহকরা চুলায় কম প্রেসার পাচ্ছেন। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে তৈরি হচ্ছে গাড়ির দীর্ঘ লাইন।
তবে পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, আবহাওয়া অনুকূলে এলে কাজ শুরু করতে কারিগরি দলগুলো পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। আটকে থাকা জাহাজগুলো নোঙর করে এলএনজি খালাস করা সম্ভব হলে দেশে গ্যাস সরবরাহ দ্রুত বাড়বে।


