ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশ জুড়ে খানাখন্দ

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশ জুড়ে খানাখন্দ
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
Advertisement
Advertisement

দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশ দিন দিন বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। টানা বৃষ্টির কারণে মহাসড়কের প্রায় ২৭ কিলোমিটার জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় বহু খানাখন্দ।

অনেক জায়গায় রাস্তার ওপরের পিচ ও সুরকি উঠে গেছে। আবার অনেক বড় বড় গর্ত বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে থাকায় খালি চোখে দেখা যাচ্ছে না। ফলে ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন চলাচল করছে হাজার হাজার যানবাহন।

বিশেষ করে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের চালকরা পড়েছেন চরম বিপাকে। রাস্তার এমন বেহাল দশায় যানবাহনের গতি কমে যাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট এবং ব্যাহত হচ্ছে পণ্য পরিবহন।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ জানিয়েছে, নষ্ট হয়ে যাওয়া অংশগুলোতে মেরামতের কাজ চলছে। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, মহাসড়ক জুড়ে এখনো অসংখ্য গর্ত রয়ে গেছে।

কিছু গর্ত ইট ও সুরকি দিয়ে সাময়িকভাবে ভরাট করা হলেও অনেক জায়গায় সেই মেরামত টেকেনি। উল্টো রাস্তা অসমান হয়ে যাওয়ায় চালকদের জন্য নতুন বিপদ তৈরি হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোতে খানাখন্দ

ছাগলনাইয়া উপজেলার নতুন সমিতি বাজার থেকে শুরু করে মুহুরীগঞ্জ, মুহুরী সেতু, কাসকা ও লেমুয়া সেতু হয়ে লালপুল পর্যন্ত গিয়ে দেখা যায়, মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়ে আছে।

বেশিরভাগ গর্ত পানিতে জমে থাকায় চালকরা আগে থেকে তা টের পাচ্ছেন না। শেষ মুহূর্তে গর্ত এড়াতে গিয়ে অনেক চালক হঠাৎ লেন বদলে ফেলছেন, যা দ্রুতগামী বাস ও ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে রাতে এবং মুষলধারে বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

মুহুরী সেতু থেকে কাসকার মধ্যকার কিছু জায়গায় সাময়িক মেরামত করা হলেও রাস্তা সমতল না থাকায় ছোট যানবাহনগুলোকে মারাত্মক ঝাঁকুনি খেতে হচ্ছে।

আবার কাসকা থেকে লেমুয়া সেতু এবং লেমুয়া সেতু থেকে লালপুল পর্যন্ত অনেক জায়গায় মেরামতের কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

সাত মাসে ৩৭ জনের মৃত্যু

মহাসড়কের ফেনী অংশে যখন ঘন ঘন দুর্ঘটনা ঘটছে, ঠিক তখনই রাস্তার এই বেহাল দশা ধরা পড়ল।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এই অংশে অন্তত ৩৫টি দুর্ঘটনার মামলা হয়েছে। ফাজিলপুর হাইওয়ে পুলিশের তথ্যমতে, গত সাত মাসে তাদের এলাকায় ১১টি দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত এবং ৭ জন আহত হয়েছেন।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে, একই সময়ে মহিপাল হাইওয়ে পুলিশের এলাকায় ২৪টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৮ জন।

এই দুই পুলিশ ফাঁড়ির তথ্য যোগ করলে দেখা যায়, বছরের প্রথম সাত মাসেই মহাসড়কের ফেনী অংশে দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, বর্ষায় রাস্তার হাল না ফিরলে দুর্ঘটনার সংখ্যা আরও বেড়ে যেতে পারে।

কমছে গতি, বাড়ছে পরিবহন খরচ

রাস্তায় গর্তের কারণে গাড়ি খুব ধীরে চালাতে হয়, ফলে প্রায়ই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। যাত্রীরা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না, আবার মালবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিবহন খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম দিয়ে আমদানি-রপ্তানির বড় অংশ আনা-নেওয়া করা হয়। আর এই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কই তার প্রধান পথ।

তারা বলছেন, মহাসড়কের এই খারাপ অবস্থার কারণে গাড়ি ভাড়ার খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যা দেশের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

দুশ্চিন্তায় চালকরা

বাস চালক রেজাউল করিম জানান, গর্ত বাঁচিয়ে সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে গিয়ে এখন বারইয়ারহাট থেকে মহিপাল যেতে অনেক বেশি সময় লাগছে।

তিনি বলেন, ‘সারাক্ষণ গর্ত এড়িয়ে গাড়ি চালাতে হয়। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়।’

মোটরসাইকেল আরোহী সায়েম চৌধুরী জানান, বৃষ্টির সময় বাইক চালানো সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, ‘জমে থাকা পানির নিচে গর্ত দেখা যায় না। কখন চাকা গর্তে পড়ে যায় তার কোনো ঠিক নেই। মোটরসাইকেল চালানো এখন খুব ঝুঁকিপূর্ণ।’

স্থায়ী সমাধানের দাবি

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন (নিসা)-এর ফেনী জেলা সভাপতি জিয়া উদ্দিন বলেন, বারবার জোড়াতালি দিয়ে মেরামত না করে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো একবারে স্থায়ীভাবে পুনর্নির্মাণ করা দরকার।

একই সঙ্গে তিনি দুর্ঘটনাপ্রবণ জায়গাগুলোতে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বসানো, গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং পুলিশের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর ফেনী জেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান তারা বলেন, দুর্ঘটনা কমাতে চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, বেপরোয়া গাড়ি চালানো বন্ধ করা এবং হাইওয়ে পুলিশের টহল বাড়ানো জরুরি।

সওজ-এর বক্তব্য

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীতি চাকমা জানান, টানা বৃষ্টির কারণেই মহাসড়কের বিভিন্ন জায়গায় গর্ত তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যেই কিছু অংশের মেরামত শেষ হয়েছে এবং বাকি অংশগুলোতে কাজ চলছে।’

তিনি আরও জানান, ‘আগামী দুই দিন যদি বৃষ্টি না হয়, তবে সব খানাখন্দ মেরামত করা সম্ভব হবে।’

তবে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী লেনটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ভারী মালবাহী গাড়িগুলো এই লেন দিয়ে বেশি চলে বলে এর ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad