দেশের অর্থনীতির গতি আরও মন্থর হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬) মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক প্রাক্কলন অনুযায়ী, এ সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ২ দশমিক ২২ শতাংশে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে শিল্প খাতে, যেখানে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়ে মাইনাস ০ দশমিক ২৮ শতাংশে নেমে গেছে।
সোমবার প্রকাশিত বিবিএসের ত্রৈমাসিক জিডিপি প্রতিবেদনে দেখা যায়, অর্থবছরের শুরু থেকেই প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক পতন ঘটেছে। প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সংশোধিত হিসাবে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) তা কমে ৩ দশমিক ০৩ শতাংশে দাঁড়ায়। আর তৃতীয় প্রান্তিকে তা আরও কমে ২ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে আসে। ফলে জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন প্রান্তিক মিলিয়ে অর্থনীতির গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় প্রান্তিকে চলতি মূল্যে দেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৩৯ হাজার ১০৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৪ লাখ ১৯ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। অর্থনীতির আকার বাড়লেও প্রবৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে শিল্প খাতে। প্রথম প্রান্তিকে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১ দশমিক ২৭ শতাংশ। কিন্তু তৃতীয় প্রান্তিকে তা নেমে যায় ঋণাত্মক ০ দশমিক ২৮ শতাংশে। এক বছর আগে একই সময়ে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, দুর্বল চাহিদা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা শিল্প উৎপাদনে বড় চাপ তৈরি করেছে।
কৃষি ও সেবা খাতেও প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ৬১ শতাংশ। সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৫২ শতাংশে নেমে এসেছে।
বিবিএসের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস তুলনামূলক কম। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বিদায়ী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হবে বলে ধারণা দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, দুর্বল রপ্তানি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির উচ্চ ব্যয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিকে চাপে রেখেছে।
সর্বশেষ ত্রৈমাসিকের তথ্য বলছে, অর্থনীতির গতি ধরে রাখতে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে শিল্প উৎপাদন পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে শক্তিশালী করা।


