শুক্রবার সকাল। বিটিভিতে সিনেমা শুরু হওয়ার আগে থেকেই দাদি-নানিদের সঙ্গে অপেক্ষায় বসে থাকত পরিবারের ছোটরা। বিজ্ঞাপনের বিরতি, মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া — কিছুই যেন দমাতে পারত না সেই অপেক্ষাকে। এ রকমই একটি ছবি ছিল ‘চাঁপাডাঙার বউ’। বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে যে ছবিটি এখনো বেঁচে আছে স্মৃতি আর আবেগের মিশেলে।
১৯৮৬ সালের ৬ জুন বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ছবিটি। পরিচালনায় ছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক, যিনি এর আগে অভিনেতা হিসেবে দর্শকের মন জয় করেছিলেন। রাজলক্ষী প্রোডাকশন্সের ব্যানারে নির্মিত এই ছবির গল্পের ভিত্তি ছিল বাংলা সাহিত্যের দিকপাল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের একই নামের উপন্যাস। ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত সেই উপন্যাস ততদিনে দুই বাংলার পাঠকের কাছে পরিচিত ছিল। তারাশঙ্করের কলমে যে বেদনাময় সংসারের ছবি ফুটে উঠেছিল, রাজ্জাক তাকে সেলুলয়েডের ফিতায় তুলে এনে দর্শকের চোখে জল এনেছিলেন।
উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে দক্ষিণ পাড়ার মণ্ডলবাড়িকে ঘিরে। বড় বউকে সবাই চেনে ‘চাঁপাডাঙার বউ’ নামে। সংসারে তার নিজের কোনো সন্তান নেই। ছোট বউ মানদার আছে এক ছেলে, নাম মানিক। এই দুই বউয়ের সম্পর্ক, টানাপোড়েন, ভালোবাসা আর বিসর্জনের কাহিনিই ছবির প্রাণ। বড় বউয়ের চরিত্রে ছিলেন শাবানা — বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল নামগুলোর একটি। তার পাশে এটিএম শামসুজ্জামান আর অরুণা বিশ্বাস।
কিন্তু ছবিটি আরও একটি কারণে ঐতিহাসিক — এই ছবির মাধ্যমে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে পদার্পণ করেছিলেন বাপ্পারাজ। নায়করাজ রাজ্জাকের পুত্র হিসেবে তার কাঁধে ছিল প্রত্যাশার বোঝা। কিন্তু প্রথম দিনের শুটিংয়েই তিনি সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। মায়ের মৃত্যুশয্যার দৃশ্যে শাবানাকে উদ্দেশ করে বলা কথাগুলো — ‘ওকে তুমি দেখে রেখো’ — একবারেই ‘ওকে’ করেছিলেন তিনি। পাশে দাঁড়ানো শাবানা, এটিএম শামসুজ্জামানরাও অবাক হয়েছিলেন।
ছবির শুটিং হয়েছিল মানিকগঞ্জের নবগ্রামে, একটানা বিশ দিন। শহরের কোলাহল থেকে দূরে গ্রামীণ প্রকৃতির মাঝে তারাশঙ্করের সেই পল্লির পরিবেশ ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল। রাজ্জাক নির্মাতা হিসেবে এই ছবিতে প্রমাণ করেছিলেন যে তার চিন্তা কেবল বাণিজ্যিক সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চলচ্চিত্র-বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘চাঁপাডাঙার বউ’-এ রাজ্জাক পরিচালক হিসেবে পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
সমালোচকেরা বলেছেন, ছবিটি নিবিষ্টভাবে দেখতে কোনো অসুবিধা হয় না। ছোট-বড় সব শিল্পীই ভালো কাজ করেছেন। সাজসজ্জা সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। শাবানা বাণিজ্যিক ছবির বাইরে এসে এই চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরেছিলেন সফলভাবে।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উপন্যাসটি আসলে দুই বাংলায়ই চলচ্চিত্রে রূপ পেয়েছে। ১৯৫৪ সালে পশ্চিমবঙ্গে নির্মল দের পরিচালনায় একই নামে তৈরি হয়েছিল আরেকটি ছবি, যেখানে উত্তম কুমার ও সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করেছিলেন। তারও তিন দশক পর বাংলাদেশে রাজ্জাক একই গল্পকে নতুন আলোয় উপস্থাপন করেন।
তারাশঙ্করের লেখার বিশেষত্ব হলো, পল্লিগাঁয়ের খেটে খাওয়া মানুষের চরিত্রের নানা মোড় আর বাঁকের নিখুঁত বর্ণনা। বড় বউয়ের নিঃসন্তান জীবন, তবু সংসারের প্রতি তার নিষ্ঠা — এই বিষয়গুলো পাঠক ও দর্শক উভয়কেই স্পর্শ করেছে বারবার।
ছবিটি মুক্তির প্রায় দুই দশক পরেও বিটিভির পর্দায় দেখানো হতো। সেই প্রজন্মের অনেকেই শৈশবে ছবিটি দেখেছেন, আর বড় হয়ে উপন্যাস পড়তে গিয়ে আবার ফিরে পেয়েছেন সেই আবেগ। রাজ্জাকের পরিচালিত ছবিগুলোর মধ্যে ‘চাঁপাডাঙার বউ’-কে মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয় — ‘মৌচোর’, ‘জ্বীনের বাদশা’ বা ‘বাবা কেন চাকর’-এর পাশাপাশি।
একটি সাধারণ গ্রামীণ পরিবারের গল্প, দুই বউয়ের জীবনসংগ্রাম ও সম্পর্কের টানাপোড়েন—এই আপাত সরল বিষয়বস্তুকেই অসাধারণ শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। আর সেই গল্পকে পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছিলেন রাজ্জাক। ফলাফল ছিল এমন এক চলচ্চিত্র, যা শুধু দর্শককে কাঁদায়নি বা ভাবায়নি, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে। এটাই প্রকৃত অর্থে একটি কালজয়ী সৃষ্টির শক্তি।


