ডলাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘গ্রুপ এফ’-এর এক শ্বাসরুদ্ধকর উদ্বোধনী ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে দুবার পিছিয়ে পড়েও ২-২ ব্যবধানের এক বীরত্বপূর্ণ ড্র তুলে নিয়েছে জাপান। সোমবারের এই ম্যাচে শেষ আধ ঘণ্টার মধ্যে দুটি গোল করে ডাচদের প্রায় নিশ্চিত দেখাতে থাকা একটি জয় কেড়ে নেয় তারা।
ম্যাচের প্রথমার্ধের খেলাটি ছিল বেশ নিয়ন্ত্রিত ও উচ্চমানের, তবে পরিষ্কার সুযোগ তৈরি হয়েছিল খুব কম। দুই দলই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা করছিল। যেখানে জাপানের উইং-ব্যাকরা মাঠের দুই প্রান্ত দিয়ে ক্রমাগত আক্রমণ তৈরি করছিল, আর নেদারল্যান্ডস প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়ে তাদের সেরা মুহূর্তগুলো উপভোগ করছিল।
খেলার শুরুর দিকে ডনিয়েল মালেনের কাছ থেকে আসা একটি দুর্দান্ত শট দারুণ দক্ষতায় রুখে দেন জাপানের গোলরক্ষক জায়ন সুজুকি। এরপর তিজানি রেইন্ডার্সের কর্নার কিক থেকে মালেনের নেওয়া আরও একটি জোরালো হেডও তিনি প্রতিহত করেন।
বিরতির আগে ডেডলক বা অচলবস্থা ভাঙার সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছেছিল জাপান। ডান প্রান্ত থেকে আসা একটি ক্রস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কেইতো নাকামুরা একটি নিখুঁত শট পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে মারেন। ফলে গোলশূন্যভাবে শেষ হয় প্রথমার্ধের খেলা।
দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হওয়ার ছয় মিনিটের মাথায় কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পায় নেদারল্যান্ডস। ৫১ মিনিটে ডান প্রান্তে আলগা বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে রায়ান গ্রাভেনবার্চ দূরবর্তী পোস্টের উদ্দেশে একটি নিখুঁত ক্রস বাড়ান। সেখানে ফাঁকা জায়গায় থাকা ভার্জিল ভ্যান ডাইক চমৎকার এক হেডে গোলরক্ষক সুজুকিকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান। দেশের হয়ে বড় কোনো টুর্নামেন্টে এটিই ভ্যান ডাইকের প্রথম গোল।
তবে জাপান পিছিয়ে পড়েও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই খেলায় সমতা ফেরায়। ৫৭ মিনিটে বাম প্রান্ত থেকে ধৈর্য ধরে বল বাড়িয়ে নাকামুরা মাঠের মাঝের অংশে চলে আসেন। এরপর দ্রুত ঘুরে গিয়ে ডি-বক্সের লাইন থেকে ডান পায়ে একটি নিচু শট নেন, যা একজন ডাচ ডিফেন্ডারের গায়ে সামান্য লেগে বার্ট ভারব্রুগেনকে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়ায়। গোলটি শুরুতে দাইজেন মায়েদার নামে দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা নাকামুরার গোল হিসেবে নিশ্চিত করা হয়।
এর মাত্র সাত মিনিটের মধ্যেই দুর্দান্ত এক মুহূর্তের হাত ধরে নেদারল্যান্ডস আবারও ম্যাচে লিড নেয়। ৬৪ মিনিটে পুরো ম্যাচ জুড়ে অসাধারণ খেলতে থাকা গ্রাভেনবার্চ ডি-বক্সের ডান প্রান্তে ক্রিসেনসিও সামারভিলকে একটি ছোট পাস দেন। এই উইঙ্গার বল নিয়ে ভেতরের দিকে ঢুকে তার বাম পায়ে এক নিখুঁত বাঁকানো শট নেন, যা সুজুকিকে পরাস্ত করে দূরবর্তী কোণ দিয়ে জালে প্রবেশ করে। এটি ছিল সামারভিলের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম গোল, যা টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও জাতীয় দলে অভিষেক না হওয়া একজন খেলোয়াড়ের অবিশ্বাস্য উত্থানকে ফুটিয়ে তোলে।
ম্যাচটি যখন নেদারল্যান্ডসের পকেটে বলে মনে হচ্ছিল, তখন তারা বেঞ্চ থেকে মেম্ফিস ডিপাই, তিউন কুপমেইনার্স এবং কুইন্টেন টিম্বারকে মাঠে নামায়। জবাবে জাপানও একসঙ্গে তিনজন খেলোয়াড় পরিবর্তন করে। এরপর সামুরাই ব্লুরা ক্রমে আক্রমণের ধার বাড়িয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায় এবং ৮৯তম মিনিটে এর ফলও পায়।
খেলার অন্তিম মুহূর্তে বদলি খেলোয়াড় কোকি ওগাওয়া দূর থেকে ভেসে আসা একটি ক্রস একদম কাছাকাছি পোস্টে হেড করেন। সেই বল দাইচি কামাদার মাথায় লেগে দিক পরিবর্তন করে অসহায় ভারব্রুগেনের মাথার ওপর দিয়ে জালে জড়িয়ে যায়। এটি কিছুটা ভাগ্যের ছোঁয়া হলেও জাপানের খেলোয়াড়দের অনবদ্য প্রচেষ্টার কারণে তারা এই গোলের সম্পূর্ণ যোগ্য ছিল।
বিশ্বকাপে নিজের অভিষেকেই দুটি অ্যাসিস্ট করে ম্যাচ শেষ করলেন ডাচ তারকা গ্রাভেনবার্চ। অন্যদিকে ভ্যান ডাইকের গোল এবং সামারভিলের সেই জাদুকরী মুহূর্তটি নিশ্চিত করেছিল ম্যাচের বেশিরভাগ সময় নেদারল্যান্ডসই ভালো খেলেছে। তবে ম্যাচের শেষ ২৫ মিনিটে জাপানের ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং আক্রমণভাগের কার্যকারিতা সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করেছে কেন তারা এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে এই টুর্নামেন্টে খেলতে এসেছে।
ম্যাচ শেষে মাঠ ছাড়ার সময় দুই দলের মনে হতে পারে তারা জয় নিয়ে ফিরতে পারত। তবে এই বীরত্বপূর্ণ ড্রয়ের ফলে পরবর্তী ম্যাচগুলোর আগে ‘গ্রুপ এফ’-এর সমীকরণ এখন বেশ জমজমাট হয়ে উঠল।


