ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগেও বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকরা নিশ্চিত ছিলেন না যে তারা আদৌ এই টুর্নামেন্ট দেখতে পারবেন কি না। তবে সেই অনিশ্চয়তা দ্রুত দর্শক টানার এক তীব্র লড়াইয়ে রূপ নেয়, যখন দেশের তিনটি টেলিভিশন চ্যানেল এবং তিনটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচ সম্প্রচারের স্বত্ব লুফে নেয়।
দেশের ফুটবল উন্মাদনাকে পুঁজি করতে বিশ্বকাপ শুরুর আগে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আইস্ক্রিন, বায়োস্কোপ প্লাস এবং টফি বেশ আগ্রাসী প্রচার শুরু করে। নিজেদের নিয়মিত সাবস্ক্রিপশন প্ল্যানের পাশাপাশি প্ল্যাটফর্মগুলো ৯৭ থেকে ৯৯ টাকার মধ্যে বিশেষ বিশ্বকাপ প্যাকেজও চালু করে।
তবে উদ্বোধনী রাতে অনেক সমর্থক এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রবেশ করতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হন। লগইনের জন্য প্রয়োজনীয় ওটিপি যেমন আসছিল না, তেমনি তা টাইপ করার আগে মেয়াদের সময় পার হয়ে যাচ্ছিল। এমনকি যারা কোনোমতে লগইন করতে পেরেছিলেন, তারাও ক্রমাগত বাফারিংয়ের মুখে পড়েন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে মুহূর্তেই অভিযোগের বন্যা বয়ে যায়, কারণ দর্শকরা লাইভ সম্প্রচারের সময় প্রতি কয়েক সেকেন্ড পরপরই বিঘ্ন ঘটার কথা জানান।
এই সম্প্রচার ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত বিশ্বস্ত সূত্রগুলো জানিয়েছে, তিনটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম তাদের ব্রডকাস্ট ফিড পাচ্ছিল রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) থেকে। দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো যেখানে সরাসরি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ফিড পায়, সেখানে একসঙ্গে একাধিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মে লাইভ ফিড সরবরাহ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা বিটিভির তেমন একটা ছিল না।
উদ্বোধনী রাতে বিটিভির নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং অ্যাপেও বাফারিংয়ের সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তবে এই বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রথম দিনের এই বিঘ্নের পর সম্প্রচারকারী রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত তাদের ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
উদ্বোধনী রাতের এই বিভ্রাট বাংলাদেশের ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো বড় আকারের লাইভ ইভেন্ট সম্প্রচারের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে আবারও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। যদিও কিছু সার্ভিস দ্রুত এই সমস্যা কাটিয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে, তবুও বিশ্বকাপ একসঙ্গে লাখো দর্শকের কাছে নিরবচ্ছিন্ন স্ট্রিমিং পৌঁছে দেওয়ার প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জগুলোকে সামনে এনেছে।
অবশ্য সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মূল সমস্যাটি ব্রডকাস্ট ফিডের চেয়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর নিজস্ব অবকাঠামোতেই বেশি ছিল। বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারী একসঙ্গে লগইন এবং ম্যাচ স্ট্রিমিংয়ের চেষ্টা করায় প্ল্যাটফর্মগুলোর সার্ভার সক্ষমতার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়।
গ্রামীণফোন ও বাংলালিংকসহ বিভিন্ন টেলিকম অপারেটরের সঙ্গে কাজ করা দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় নেটওয়ার্ক সার্ভিস দেওয়া প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, প্ল্যাটফর্মগুলো সম্ভবত দর্শক চাহিদার বিষয়টি হালকাভাবে নিয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘টফির সক্ষমতা আসলে বেশ সীমিত। আপনার ব্যান্ডউইথ যদি ৫০০ ব্যবহারকারীকে সেবা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়, তবে আপনি কি বাস্তবসম্মতভাবে ৫ হাজার ব্যবহারকারীকে সেবা দিতে পারবেন? এমনকি বিটিভিও প্রথম দিনের পর তাদের ব্যান্ডউইথ বাড়িয়েছে।’
তিনি জানান, ওটিপির সমস্যাটি সার্ভার সক্ষমতা এবং ব্যান্ডউইথের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিষয় ছিল।
‘ওটিপির বিষয়টি ভিন্ন। কোনো একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে ঠিক কতখানি ট্রাফিক বা কতজন ব্যবহারকারী একসঙ্গে যুক্ত হবেন, তা আগে থেকে নির্ভুলভাবে অনুমান করার কোনো উপায় নেই। তাই ওটিটি অবকাঠামোর সঙ্গে এর আসলে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।’
বাফারিংয়ের সমস্যার বিষয়ে এই কর্মকর্তা আরও বলেন, বিশ্বকাপের মতো এত বড় একটি ইভেন্টের কথা মাথায় রেখে প্ল্যাটফর্মগুলোর আগেইতাদের সক্ষমতা বাড়ানো উচিত ছিল।
তিনি বলেন, ‘ব্যান্ডউইথ যদি অপর্যাপ্ত হয়, তবে এই ধরনের বিভ্রাট ঘটতেই পারে। এটি অনেকটা একটি ওয়েবসাইটে একই সময়ে অস্বাভাবিক রকমের উচ্চ মাত্রার ট্রাফিক বা দর্শক আসার কারণে সাইট ধীরগতির হয়ে যাওয়া বা ক্র্যাশ করার মতোই ব্যাপার।’
টফির মূল প্রতিষ্ঠান বাংলালিংক অবশ্য প্রথম রাতের এই অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যার কথা স্বীকার করেছে। বাংলালিংকের করপোরেট কমিউনিকেশনস প্রধান গাজী তৌহিদ আহমেদ টাইমসকে বলেন, ‘টফিতে বিশ্বকাপের লাইভ স্ট্রিমিংয়ের সময় যারা বিঘ্নের সম্মুখীন হয়েছেন, সেসব গ্রাহক ও সাবস্ক্রাইবারদের কাছে আমরা আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। আমরা তাদের হতাশার বিষয়টি বুঝতে পারছি এবং এই সাময়িক অসুবিধার জন্য গভীরভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের টিমগুলো এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে এবং প্ল্যাটফর্মের কার্যক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে বিশ্বকাপের ফিড স্বত্বাধিকারী ও প্রযুক্তিগত অংশীদারসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। আমাদের গ্রাহকদের ধৈর্য, নিরবচ্ছিন্ন সমর্থন এবং আস্থার জন্য আমরা ধন্যবাদ জানাই।’ তবে সার্ভার বা ব্যান্ডউইথের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বাংলালিংক সুনির্দিষ্ট কোনো প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা দেয়নি।
এদিকে, গ্রামীণফোনের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বায়োস্কোপ প্লাসও এই সমস্যার জন্য একটি কারিগরি ত্রুটিকে দায়ী করেছে। গ্রামীণফোনের কমিউনিকেশনস প্রধান শরফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘একটি অপ্রত্যাশিত কারিগরি ত্রুটির কারণে বায়োস্কোপ প্লাসে ফিফা বিশ্বকাপ স্ট্রিমিং করার সময় কিছু গ্রাহক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন। আমাদের টিম অত্যন্ত অগ্রাধিকারের সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক সেবা ফিরিয়ে আনতে কাজ করেছে। এই অসুবিধার জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি এবং গ্রাহকদের ধৈর্য ও সহযোগিতার মূল্যায়ন করছি।’
যখন সুনির্দিষ্টভাবে ওটিপি না আসা এবং বাফারিংয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে জানতে চাওয়া হয়, তখন গ্রামীণফোনের এক্সটার্নাল কমিউনিকেশনস প্রধান অঙ্কিত সুরেকাও দাবি করেন, সমস্যাটি একটি সাময়িক কারিগরি ত্রুটি থেকে তৈরি হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘এটি একটি কারিগরি ত্রুটি ছিল। ঠিক পরের ম্যাচ থেকেই সমস্যাটি সমাধান করা হয়েছে। গতকাল মানুষ কোনো বিঘ্ন ছাড়াই খেলা দেখেছে, এমনকি আমিও দেখেছি।’
দর্শকরাও পরবর্তী ম্যাচগুলোর সম্প্রচারে এই উন্নতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন; বিশেষ করে ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচ চলাকালীন স্ট্রিমিংয়ের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছিল। উদ্বোধনী রাতে সমস্যার মুখোমুখি হওয়া মোস্তাফিজুর রহমান নামের এক ফুটবল অনুরাগী টাইমসকে বলেন, ‘সমস্যার সমাধান হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। স্ট্রিমিংয়ের মান এইচডি ছিল এবং কোনো বাফারিং ছিল না।’
প্রাথমিক ধাক্কার পর বায়োস্কোপ প্লাস তাদের কারিগরি সক্ষমতা বাড়িয়েছে বলে মনে হলেও, সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে যে টফি এখনো অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছে।
টেলিকমিউনিকেশন টাওয়ার সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান ইডটকো বাংলাদেশের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘টফির সার্ভার সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে এখনো সীমিত। সাধারণভাবে বলতে গেলে অধিকাংশ অপারেটরের ইতোমধ্যে একটি নির্দিষ্ট স্তরের সার্ভার অবকাঠামো রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গ্রামীণফোন এবং রবির মতো কোম্পানিগুলোর নিজস্ব বড় আকারের সার্ভার রয়েছে।’
‘তবে টফির সার্ভার সক্ষমতা খুব একটা বড় নয়। বিশ্বকাপের মতো এত বড় একটি ইভেন্ট তারা স্ট্রিমিং করতে যাচ্ছিল, তাই প্রশ্ন ওঠে যে তাদের আগে বড় কোনো সার্ভার সক্ষমতার জন্য বিনিয়োগ বা ব্যবস্থা করা উচিত ছিল কি না। আমি যতটুকু জানি, তারা তা করেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বড় কোনো ক্রীড়া ইভেন্টের সময় ট্রাফিকের এমন আকস্মিক বৃদ্ধি খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা। মূল সমস্যাটি ছিল ট্রাফিকের হঠাৎ উপচে পড়া ভিড়। প্রতিটি প্ল্যাটফর্মেরই সার্ভার থাকে, কিন্তু সেগুলোর সক্ষমতা ভিন্ন হয়। তারা সম্ভবত এত বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারীর উপস্থিতি আশা করেনি, যার ফলে চাপ সার্ভার সক্ষমতার বাইরে চলে যায় এবং তা ক্র্যাশ করে। এমনকি নেটফ্লিক্স বা অ্যামাজনের মতো বিশ্বমানের প্ল্যাটফর্মগুলোতেও অপ্রত্যাশিত ট্রাফিক বাড়লে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।’


