ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন ঘিরে এবার যে সংগঠনটি সবচেয়ে আলোচনায় এসেছে তা হলো ইসলামী ছাত্র শিবির ও তাদের সমর্থিত প্যানেল। ’২৪ পরবর্তী বাস্তবতায়, দীর্ঘদিন প্রান্তিক অবস্থায় থাকা ছাত্রশিবির এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বেশ জোরেশোরেই এবং নানা কারণে তারা এসেছে আলোচনার কেন্দ্রে।
শুরু থেকেই অভিযোগ ওঠে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিবিরকে সুবিধা তো দিচ্ছেই না, বরং তাদের কার্যক্রম সীমিত করার চেষ্টা করছে। শিবির-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ তাদের প্রচারণা চলাকালে জানায়, প্রশাসন ছাত্রলীগ বা ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। এ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি অভিযোগ তোলেন, তারা ক্যাম্পাসে প্রচারণার স্বাধীনতা পাচ্ছেন না। এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত না হলেও, প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ফলে ক্যাম্পাসজুড়ে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে শুরু হয় বড় ধরনের বিতর্ক।
এছাড়া বিতর্ক তৈরি হয়েছে ডাকসুতে শিবির-সমর্থিত প্রার্থীদের বৈধতা নিয়েও। শিবির প্রার্থী এসএম ফরহাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ২০২২ সালের একটি ইউনিট কমিটিতে তার নাম ছিল। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ফাহমিদা আলম হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন।
এতে আদালত নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্থগিতাদেশ দিলে পুরো ক্যাম্পাসেই সৃষ্টি হয় তীব্র উত্তেজনা। নির্বাচন কমিশন পড়ে বিপাকে, এক পর্যায়ে নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা দেখা দেয়। তবে খুব দ্রুত সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জজ আদালত হাইকোর্টের ওই আদেশ স্থগিত করে এবং নির্বাচনের পথ সুগম হয়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেখা দেয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদল মনে করে, শিবির প্রার্থীদের যোগ্যতা নিয়েই রয়েছে প্রশ্ন। অন্যদিকে আরেক দল মনে করে, আদালতের দ্রুত হস্তক্ষেপই নির্বাচনী প্রক্রিয়া অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
তবে সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায় তখন, যখন ছাত্রশিবিরের প্রার্থিতার বিরুদ্ধে রিটকারী নারী শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আলী হোসেন নামে আরেক শিক্ষার্থী ফেসবুকে ‘গণধর্ষণের মিছিল’ বের করার হুমকি দেন। হুমকিদাতা আলী হোসেন শিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এই ভয়ঙ্কর হুমকি-পোস্টের পর ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভ। প্রতিবাদে রাস্তায় নামে নারী শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি, শিক্ষক সমিতির কয়েকজনও লিখিতভাবে দোষীদের শাস্তি দাবি করেন। বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে এ ঘটনায় এক ধরনের ভীতি ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে নারী প্রার্থীরা প্রচারণা চালাতে গিয়ে দ্বিধায় পড়েন।
শিবিরের পক্ষ থেকে যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ওই হুমকির দায় অস্বীকার করা হয়, তবু সংগঠনের ভাবমূর্তিতে আসে বড় ধাক্কা।

নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগও ওঠে শিবিরকে ঘিরে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সরাসরি অভিযোগ করে যে, শিবির সমাজ কল্যাণ অনুষদের নবীনবরণ অনুষ্ঠানের আড়ালে খাবার পরিবেশন করেছে এবং সরাসরি ভোট প্রার্থনা করেছে।
নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত শুরু করলেও বড় ধরনের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়নি। এর ফলে প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে আবারও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং শিবিরের প্রচারণা কৌশলকে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ‘অস্বচ্ছ আচরণ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম দিনেই চারুকলা অনুষদ এলাকায় শিবির-সমর্থিত প্রার্থীর পোস্টার ও ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়। শিবির প্যানেল সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করে এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করতে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার দাবি জানায়। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দেয় যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিন্তু এই ঘটনায় শিবির সমর্থকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ।
নির্বাচন ঘিরে অনলাইন প্রোপাগান্ডা ও অপপ্রচারও বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। শিবির-সমর্থিত প্রার্থীসহ কয়েকজন নারী প্রার্থীকে নিয়ে ফেসবুক ও অন্যান্য মাধ্যমে কটূক্তি, গুজব ও বিদ্বেষপূর্ণ কনটেন্ট ছড়ানো হয়।

নারী প্রার্থীরা অভিযোগ করেন যে, তাদের টার্গেট করে ‘সাইবার বুলিং’ চালানো হচ্ছে এবং এতে প্রচারণার ক্ষেত্রে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুলিশের সাইবার ইউনিটে অভিযোগ পাঠালেও এখনো এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে প্রগতিশীল গোষ্ঠীসহ নানা সংগঠন সাইবার সহিংসতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে।
শিবিরকে ঘিরে আরেকটি আলোচিত ঘটনা হচ্ছে তাদের নিজস্ব প্যানেল থেকে সদস্য বহিষ্কার। জয়েন উদ্দিন সরকার তন্ময় নামে এক প্রার্থী ১৯৭১ এর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে ‘হাইজ্যাকার’ বলে আখ্যা দেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে শুরু হয় প্রবল বিতর্ক এবং শিবির তাৎক্ষণিকভাবে তাকে প্যানেল থেকে বহিষ্কার করে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে। কিন্তু ততক্ষণে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ে এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানের দায়ে শিবিরকে অভিযুক্ত করা হয়। এতে আবারো প্রশ্নবিদ্ধ হয় সংগঠনের ভাবমূর্তি।


