একটা সময় ছিল যখন তিয়ানআনমেন, তিব্বত এবং তাইওয়ান—এই তিনটি ‘টি’ দিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বোঝানো হতো। কিন্তু গত তিন দশকে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং মার্কিন আধিপত্যের জন্য একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জার হিসেবে আবির্ভূত হওয়ায় আলোচনার প্রেক্ষাপট নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। ২০২৬ সালে বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যকার শীর্ষ সম্মেলনে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল নতুন চারটি ‘টি’। এগুলো হলো—ট্রেড (বাণিজ্য), টেকনোলজি (প্রযুক্তি), তাইওয়ান এবং তেহরান।
এই সম্মেলনটি কেবল দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্যই নয়, বরং বিশ্ব ব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। কারণ এই বৈঠকের ফলাফল হয় ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা কমিয়ে দেবে, না হয় একাধিক অঞ্চলে অনিশ্চয়তাকে আরও গভীর করবে।
দুই নেতার জন্যই এক রাজনৈতিক স্পর্শকাতর সময়ে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে রয়েছেন। বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং জ্বালানির দাম নিয়ে জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে। অন্যদিকে চীনও তার নিজস্ব অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করছে। এর মধ্যে রয়েছে মন্থর প্রবৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ চাহিদার অভাব এবং তরুণদের বেকারত্ব, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ১৬ শতাংশের উপরে রয়েছে।
তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, শি জিনপিং এই আলোচনায় কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে অংশ নিয়েছেন। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়া এবং নির্বাচনী চক্রের রাজনৈতিক চাপ ওয়াশিংটনের দরকষাকষির ক্ষমতাকে সীমিত করতে পারে। অন্যদিকে শি জিনপিংয়ের সামনে কোনো তাৎক্ষণিক নির্বাচনী বাধ্যবাধকতা নেই এবং তিনি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করতে পারেন।
সহজ কথায়, শি জিনপিং এই আলোচনায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। কারণ তার কাছে এমন কিছু আছে যা ট্রাম্পের কাছে নেই, আর তা হলো—সময়।
কৌশলগত সম্পৃক্ততা থেকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ট্রাম্পের এবারের বেইজিং সফরের পরিবেশ ২০১৭ সালের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। সেই সময় বেইজিং বিশ্বমঞ্চে চীনের ক্রমবর্ধমান মর্যাদা প্রদর্শন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখার লক্ষ্যে ট্রাম্পকে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। ট্রাম্পকে চীনের প্রাচীন সম্রাটদের নিবাস ‘ফরবিডেন সিটি’ ঘুরে দেখার বিরল সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এর বাইরে তার আগমনী অনুষ্ঠান চীনা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল, যা কোনো বিদেশি নেতার জন্য ছিল এক অস্বাভাবিক সম্মান। তখন চীন তার ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক ভূমিকাকে মেনে নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করাতে আগ্রহী ছিল।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ওয়াশিংটন এখন চীনকে কেবল একটি বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠনে সক্ষম একটি ভূ-রাজনৈতিক সমকক্ষ এবং কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। ক্ষমতার ভারসাম্যের এই পরিবর্তন বৃহস্পতিবারের আলোচনায় প্রতিফলিত হয়েছে। সেখানে শি জিনপিং কথিত ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’ বা ফাঁদ এড়ানো সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন বলে জানা গেছে।
চীনা কর্মকর্তাদের মতে, শি জিনপিং ট্রাম্পকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র কি তথাকথিত থুসিডাইডিস ট্র্যাপ কাটিয়ে উঠে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে?” প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিসের লেখা থেকে উদ্ভূত এই তত্ত্বটি একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতিকে নির্দেশ করে, যেখানে একটি উদীয়মান শক্তি বিদ্যমান প্রভাবশালী শক্তিকে হটিয়ে দেওয়ার হুমকি তৈরি করে। এর ফলে প্রায়ই সংঘাত বা যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার আলোচনায় এই ধারণাটি এখন নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিভ্রাটে ফুটে উঠেছে পারস্পরিক অবিশ্বাস
অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাজানো এই কূটনীতির মাঝেও সফরের সময় বেশ কিছু ছোটখাটো নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঘটনা ঘটেছে, যা দুই শক্তির মধ্যে অন্তর্নিহিত উত্তেজনা এবং আস্থার অভাবকে প্রকাশ করে দিয়েছে। গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টকে শুরুতে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। চীনা নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, তার কাছে সঠিক পরিচয়পত্র নেই। টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা গেছে, রক্ষীরা প্রবেশপথে বেসেন্টকে থামিয়ে দিয়েছেন এবং ভেতরে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় সিকিউরিটি পিন দেখানোর জন্য বলছেন। পরে অবশ্য তাকে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
এর কিছুক্ষণ পরেই চীনা নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সদস্যদের আরও একটি সংক্ষিপ্ত বাদানুবাদ ঘটে। সেই প্রতিনিধি দলে একজনকে সামরিক ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় দেখা গিয়েছিল। এছাড়া পরবর্তীতে টেম্পল অব হেভেনে ট্রাম্প ও শি’র যৌথ সফরের সময় এক সশস্ত্র মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টকে শুরুতে প্রবেশ করতে দিতে রাজি হননি চীনা নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। দীর্ঘ আলোচনার পর উভয় পক্ষ একটি সমঝোতায় পৌঁছায় এবং নির্ধারিত কর্মসূচি বড় কোনো বিঘ্ন ছাড়াই শেষ হয়।
যদিও এই ঘটনাগুলো ছোট মনে হতে পারে, তবুও এগুলো এই শীর্ষ সম্মেলনকে ঘিরে তীব্র নিরাপত্তা সংবেদনশীলতাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। একইসঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কৌশলগত সতর্কতার বৃহত্তর চিত্রটিকেই প্রতিফলিত করছে।


