নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে টাঙ্গাইলের আটটি আসনে নির্বাচনী উত্তাপ ততই বাড়ছে। চায়ের আড্ডা থেকে অলিগলি সর্বত্রই এখন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা। ভোটাররা মুখিয়ে আছেন তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে।
আসন্ন নির্বাচনে টাঙ্গাইল জেলার আটটি আসনের মধ্যে অন্তত চারটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এতে বেকায়দায় ধানের শীষের প্রার্থীরা। এ ছাড়া জামায়াত প্রার্থীরাও তাদের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবেন বলে ধারণা স্থানীয়দের। একটি আসনে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তিনিও ওই আসনে বিএনপির প্রার্থীকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবেন।
টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ফকির মাহবুব আনাম স্বপন (স্বপন ফকির)। আগের কয়েকটি নির্বাচনে বিএনপি থেকে অংশ নিলেও তিনি জয়ের মুখ দেখতে পাননি। স্বপন ফকিরের আদি নিবাস এই নির্বাচনী এলাকার বাইরে ভুয়াপুর উপজেলায়। এবারের নির্বাচনে এই আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির আরেক কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে তিনি দুঃসময়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মামলা-মোকদ্দমা মোকাবিলায় সহযোগিতা করেছেন। সেই সঙ্গে আন্দোলন সংগ্রামেও ছিলেন সামনের কাতারে। জেল-জুলুম ও নির্যাতন নিয়েই রাজনীতি করেছেন সব সময়। তাই দলে তার যেমন অবস্থান আছে, তেমনি নির্বাচনী এলাকার মানুষের কাছেও আছে জনপ্রিয়তা। ফলে বিএনপির প্রার্থীকে ভালোভাবেই চ্যালেঞ্জ জানাবেন তিনি। স্থানীয়দের ধারণা আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় বিএনপিবিরোধী ভোটারদের কেন্দ্রে টানতে পাড়লে শক্ত অবস্থানে থাকতে পারেন তিনি।
টাঙ্গাইল-৩ ঘাটাইল উপজেলা নিয়ে গঠিত। এখানে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ওবায়দুল হক নাসির। জেলার তরুণ নেতা ওবায়দুল হক নাসির এবারই প্রথম এমপি প্রার্থী হয়েছেন। এ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী লুৎফর রহমান খান আজাদ। তিনি বিএনপি থেকে তিন বারের নির্বাচিত এমপি ছিলেন। এ ছাড়া দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও তিনবার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তার সমর্থকও অনেক। তাই এই আসনে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভাজন দেখা দিয়েছে।
ওবায়দুল হক নাসির কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ফ্যাসিবাদের সময়ে রাজপথে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন, এর পুরস্কার হিসেবে বিএনপি তাকে মনোনয়ন দিয়েছে বলে অনেকের দাবি। তবে অনেক নেতাকর্মী জানান, নাসির বহিরাগত তথা অন্য নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা, আর লুৎফর রহমান খান আজাদ এলাকায় জনপ্রিয়। এমপি-মন্ত্রী থাকাকালীন এলাকায় তিনি ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন।
জেলার আরেক আসন টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী)। এখানে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শিল্পপতি লুৎফর রহমান মতিন। তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপিতে যোগ দিয়ে নমিনেশন পান। হেভিওয়েট প্রার্থী তৎকালীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য স্বাধীনতা যুদ্ধের সংগঠক আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর কাছে পরাজিত হন। লতিফ সিদ্দিকী পরে দল থেকে বহিষ্কার হলেও গত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে এমপি হন। এবারও তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। এ আসনে লুৎফর রহমান মতিনের সঙ্গে লতিফ সিদ্দিকীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে স্থানীয় ভোটারদের অভিমত।

জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন টাঙ্গাইল-৫। জেলা সদর উপজেলা হওয়ায় পুরো জেলায় এ আসনের প্রভাব আছে। এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। ছাত্রদল, যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্ব পালন করা সালাউদ্দিন টুকু সর্বমহলে পরিচিত। তাছাড়া বিগত সময়ে রাজপথে সাহসী ভূমিকা রাখা, পরিবারসহ নির্যাতিত হওয়ায় কেন্দ্রীয় নেতারা টুকুর প্রতি আস্থা রেখেছেন।

এই আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল। এখানেও নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বিমুখী অবস্থান দেখা যাচ্ছে। আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা, পরিবারের ত্যাগ স্বীকার ইত্যাদি কারণে সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর পক্ষের দাবি, যত বাধাই আসুক আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত সুলতান সালাউদ্দিন টুকু নিশ্চিত বিজয় অর্জন করবেন। অন্যদিকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল সমর্থকদের দাবি, ছাত্রদল ও মূল দলের জেলার নেতৃত্ব দেওয়ায় এবং স্থানীয় হিসেবে এই নির্বাচনে ভোটাররা তাকেই বেছে নেবে। তার পক্ষের দাবি, নির্বাচনে বিএনপির দুই প্রার্থীর টানাপোড়নে ভোটাররা ইতোমধ্যে জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। জামায়াত মনে করে এই সদর আসনে তারা সুস্পষ্ট ব্যবধানে জয়লাভ করতে পারবে।
জেলার আরেকটি আলোচিত আসন টাঙ্গাইল-৮, যেটি সখিপুর ও বাসাইল উপজেলা নিয়ে গঠিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে এ অঞ্চল আলোচিত। এই আসনটি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর আসন হিসেবে পরিচিত। কিন্তু আসন্ন নির্বাচনে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ অংশ না নেওয়ায় এবারের নির্বাচন অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম। তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন শিল্পপতি সালাউদ্দিন আলমগীর রাসেল। ইতোমধ্যে কাদের সিদ্দিকী এবং বিএনপির একটি বড় অংশ সালাউদ্দিন আলমগীর রাসেলকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগবিহীন নির্বাচনেও বিএনপির আহমেদ আজম নিরাপদ নয়।
সরেজমিন টাঙ্গাইলের নির্বাচনী এলাকা পরিদর্শনে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। একক বৃহত্তম দল হিসেবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে বলে জেলার সাধারণ মানুষের ধারণা। একদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, বহিষ্কার নিয়ে চাপা উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে, আরেকদিকে বিএনপির এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে জামায়াত জোট নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে কে শেষ হাসি হাসবে তা নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।


