সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট তাৎক্ষণিকভাবে প্যানিক বায়িংয়ের প্রভাবে তীব্র আকার নিলেও এর পেছনে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, নীতিগত অসামঞ্জস্য এবং বাড়তে থাকা আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কাজ করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শনিবার পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে তারা বলেন, সমন্বিত বার্তার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে এবং এর প্রভাব ইতোমধ্যে শিল্প ও কৃষি খাতে পড়েছে।
‘জ্বালানির ফাঁদে বন্দী অর্থনীতি?’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত হওয়া ওয়েবিনারটির সঞ্চালনা করেন অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নীতিগত সমন্বয়ের ওপর জোর দেন বিশেষজ্ঞরা।
পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, ‘চার থেকে আট তারিখের মধ্যে স্বাভাবিকের আড়াই গুণ তেল বিক্রি হয়েছে, যা সম্পূর্ণ প্যানিক বায়িং।’
তিনি বলেন, ‘রেশনিং চালু ও দ্রুত তুলে নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে এবং মজুত প্রবণতা বাড়িয়েছে।’
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘রেশনিং ও কৃচ্ছ্বতা নিয়ে ঘোষণাগুলো মানুষকে আতঙ্কিত করেছে।’
এ ছাড়া তিনি যোগ করেন, নীতিগত বার্তার অসামঞ্জস্যই প্যানিক পরিস্থিতিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
শিল্পখাত নিয়ে পারভেজ বলেন, চলমান জ্বালানি সংকটে শিল্পখাতে উৎপাদন ৪০-৪৫ শতাংশ কমেছে এবং উৎপাদন ব্যয় ৩০-৩৫ শতাংশ বেড়েছে। তিনি জানান, নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসার বিক্রিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
পদ্মা অয়েলের চেয়ারম্যান ও সাবেক জ্বালানি সচিব একেএম জাফর উল্লাহ খান বলেন, ‘দাম বাড়ানো সরাসরি চাহিদা কমায়নি, তবে মজুত করে বেশি দামে বিক্রির প্রবণতা কমিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘৪৫ থেকে ৬০ দিনের কৌশলগত মজুত রাখতে না পারলে এমন চাপ সামাল দেওয়া কঠিন।’
জ্বালানি খাতের ব্যাবসায়ী ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিসেস এর চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদুল হক বলেন, জেটির ড্রাফট সীমাবদ্ধতার কারণে বড় জাহাজে এলপিজি আনা যায় না, ফলে খরচ বাড়ে।
তিনি আরও বলেন, ‘বাজারে এখন ৩-৪টি কোম্পানি ৬০-৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, যা সরবরাহ ও দামে ঝুঁকি তৈরি করছে।’
আলোচনায় উঠে আসে, দেশে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা সরাসরি অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে।
কৃষিবিজ্ঞানী প্রফেসর সাত্তার মন্ডল বলেন, ‘দেশে প্রায় ৪২ লাখ ডিজেলচালিত যন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে—কৃষি এখন জ্বালানিনির্ভর।’ তিনি বলেন, ‘সেচে বিঘ্ন ঘটায় বোরো উৎপাদন সম্ভাব্য ক্ষতির মুখে পড়েছে।’
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ায় সেচ ব্যয় বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত কৃষকের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ফ্লোর আলোচনায় জ্বালানি সাংবাদিক মোল্লা আমজাদ হোসেন বলেন, ‘এটি এক দিনের সংকট নয়-দীর্ঘদিনের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার ফল।’তিনি জানান, দেশে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
সেমিনারের সঞ্চালক হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘এই সংকট দেখিয়েছে যে শুধু সরবরাহ নয়, মেসেজিংও গুরুত্বপূর্ণ। সমন্বিত বার্তার অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।’
আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা সরবরাহ অবকাঠামো উন্নয়ন, স্টোরেজ সক্ষমতা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং কৃষি ও শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমন্বিত জ্বালানি নীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন।


