ক্রমাগত জলবায়ু সতর্কতার পরও গত বছর বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে বড় ব্যাংকগুলো। এতে অন্তত আরও ১০ বছর পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার পেছনে গত বছরের কার্বন নির্গমন সম্ভাব্য ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৫ সালে বিশ্বের ৬৫টি বড় ব্যাংক জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পে মোট ৯০৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিতে এই বিনিয়োগ ২০২৪ সালের তুলনায় ৬৫ বিলিয়ন ডলার বেশি।
জীবাশ্ম জ্বালানি মূলত মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর অবশিষ্টাংশ থেকে তৈরি প্রাকৃতিক শক্তি যা কোটি কোটি বছর ধরে মাটি ও পাথরের নিচে উদ্ভূত হয়ে থাকে এবং মানুষ তা উত্তোলন করে শক্তি উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করে।
শুক্রবার ২০২৬ সালের ‘ক্লাইমেট ক্যাওস ব্যাংকিং’ প্রতিবেদনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। এই প্রতিবেদন রেইনফরেস্ট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক এবং এর সহযোগী সংস্থাগুলোর উদ্যোগে প্রতি বছর প্রকাশিত হয় এবং এতে বিশ্বব্যাপী ব্যাংকের জীবাশ্ম জ্বালানি বিনিয়োগের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জীবাশ্ম খাতে বিনিয়োগে তিন বছর ধরে প্রথম স্থান ধরে রেখেছে জেপিমরগান চেস ব্যাংক। তারা ২০২৫ সালে জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিতে ৫৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১২ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। তালিকায় এরপরই রয়েছে ব্যাংক অব আমেরিকা, এমইউএফজি, মিজুহো ফাইন্যান্সিয়াল এবং সিটিগ্রুপ। তারা প্রত্যেকেই এই খাতে ৪৫ থেকে ৪৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
তবে জীবাশ্ম জ্বালানিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো- মিডস্ট্রিম সেক্টরে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, যা তেল ও গ্যাস পরিবহন, সংরক্ষণ এবং বাণিজ্য পরিচালনা করে। এই খাতে বিনিয়োগ ৮৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালে ১১৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনের সহ-লেখক ও রেইনফরেস্ট অ্যাকশন নেটওয়ার্কের গবেষণা পরিচালক নিকো লুসিয়ানি বলছেন, এসব বিনিয়োগের অনেকগুলোই গ্যাস তরলীকরণ প্রকল্পে ভূমিকা রেখেছে, যা ২০২৫ সালের সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জীবাশ্ম জ্বালানী উৎপাদনের নতুন অবকাঠামোর জন্যও ব্যাংকের বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। শীর্ষ ৬৫ ব্যাংক এই খাতে ৫০৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি।
প্রতিবেদকেরা বলছেন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি আগামী দশকের কার্বন নির্গমন, স্থানীয় দূষণ, সরবরাহ ঝুঁকি এবং ব্যর্থ সম্পদ ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দেখিয়েছে- বিশ্ব অর্থনীতি এখনও জীবাশ্ম জ্বালানীর উপর নির্ভরশীল। তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং উচ্চ মূল্য সত্ত্বেও প্রধান ব্যাংকগুলো নতুন জীবাশ্ম জ্বালানি সম্প্রসারণে বিনিয়োগ চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রায় দুই হাজার ব্যাংক পর্যালোচনা করে শীর্ষ ‘ডার্টি ডজন’ তালিকায় এসেছে ওয়েলস ফার্গো, রয়্যাল ব্যাংক অব কানাডা, বার্কলিস, এসএমবিসি গ্রুপ, মর্গান স্ট্যানলি, গোল্ডম্যান স্যাকস এবং টরন্টো-ডোমিনিয়ন ব্যাংকের নাম।
এরা মোট জীবাশ্ম জ্বালানি বিনিয়োগের প্রায় ৩৯ শতাংশের জন্য দায়ী। অন্য ব্যাংকগুলো মাত্র ২৬ শতাংশ অবদান রেখেছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের একটি বড় অংশ নির্ধারিত কিছু ব্যাংক কুক্ষিগত করে রেখেছে বলেও মনে করে রেইনফরেস্ট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক।
গত পাঁচ বছরে কেবল ১০টি জীবাশ্ম জ্বালানি সংস্থা মোট বিনিয়োগের ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পেয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে এনব্রিজ। তারা উত্তর আমেরিকায় বড় পাইপলাইন সম্প্রসারণ করছে এবং ২০২১–২০২৫ সালের মধ্যে ১২৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে। ২০২৫ সালে শীর্ষ ১০ সংস্থা মোট বিনিয়োগের ১৫ দশমিক ২ শতাংশ পেয়েছে, যেখানে এলএনজি জায়ান্ট ভেঞ্চার গ্লোবাল পেয়েছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ।
নিকো লুসিয়ানি বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের এবং চুক্তিকারীদের মধ্যে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট অর্থনৈতিক ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি করছে।’
এই বছরের প্রতিবেদন বলছে, এই বিনিয়োগের বৃদ্ধি ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমিয়ে আনার সীমা অর্জনে আলোচিত প্যারিস চুক্তির সঙ্গে ‘পরিপূর্ণভাবে অসমঞ্জস্যপূর্ণ’। তাদের তথ্যানুযায়ী, চুক্তি সইয়ের ১০ বছর পরে অনেক ব্যাংক তাদের জলবায়ু নীতি থেকে ফিরে যাচ্ছে।
জেপিমরগান চেসের স্থায়িত্ব রিপোর্টে বলা হয়েছে, তারা চুক্তির ‘সময়সীমা এবং শতাংশ-নির্ধারিত’ কার্বন নির্গমন লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে। ওয়েলস ফার্গোও তাদের ২০৩০ ইন্টারিম নির্গমন লক্ষ্য এবং ২০৫০ সালের নেট-জিরো লক্ষ্য বাতিল করেছে এবং রয়্যাল ব্যাংক অব কানাডা সম্প্রতি ২০৩০ সালের নির্গমন লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর বেশিরভাগ নীতি পরিবর্তন ‘বিদ্যমান নীতির হ্রাস’ ছিল, উন্নয়ন নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জলবায়ুবিরোধী রাজনৈতিক চাপ এ বিষয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।
দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়েই দেশটির এনার্জি বিভাগ জলবায়ু নীতি সংক্রান্ত একাধিক নিয়ম শিথিলের ঘোষণা দেয়। এর মধ্যে রয়েছে ‘আমেরিকান এনার্জি আনলিশিং’ নির্বাহী আদেশ। এই আদেশে জীবাশ্ম জ্বালানি উন্নয়নের ওপর বাধা কমিয়ে আনার ঘোষণা দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনের সহ-লেখক, ব্যাংকট্র্যাকের ক্যাম্পেইন লিড দিওগো সিলভা বলেন, ‘ব্যাংকগুলো বলে থাকে তারা জলবায়ুর জন্য দায়বদ্ধ, তারপর রাজনৈতিক চাপ বাড়লেই তাদের নীতি বাতিল করে। স্বেচ্ছাসেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির সময়ও শেষ হয়। আমাদের প্রয়োজন বাধ্যতামূলক নিয়ম, প্রতিশ্রুতি নয়।’
নিকো লুসিয়ানির ভাষায়, ‘এই বিনিয়োগ আগেও ঘটছিল, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি হয়তো তার পরিমাণ বাড়িয়েছে। মার্কিন ব্যাংকগুলোই বর্তমান বিনিয়োগের বড় অংশ দিচ্ছে এবং তাদের নীতি অন্য দেশের তুলনায় অসঙ্গত।’
জেপিমরগান চেসের এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘আমরা বিশ্বের অন্যতম বড় শক্তি বিনিয়োগকারী হিসেবে সব ধরনের শক্তি সমাধান ও প্রযুক্তি সমর্থন করি। আমাদের ডেটা তৃতীয় পক্ষের অনুমানের তুলনায় আরও সঠিক।’
এলএনজি রপ্তানি টার্মিনালগুলো সাধারণত ১৫–২০ বছরের বিক্রয় চুক্তির ভিত্তিতে অর্থায়ন পায়। নতুন প্রতিটি প্রকল্পে বহু দশকের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এটিও কার্বন নির্গমন বাড়ার জন্য উদ্বেগজনক।
নিকো লুসিয়ানি বলেন, ‘এলএনজি বিনিয়োগ দেশে দেশে অস্থির ও ব্যয়বহুল শক্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করছে, যা অনেক দেশ চাইছে না, কিন্তু তা নেবার জন্য তাদের চাপ দেওয়া হচ্ছে।’
কয়লা খাতেও বিনিয়োগ ২০২৫ সালে নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কয়লা খনির জন্য ৭৭ শতাংশ এবং কয়লা শক্তি জন্য ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। তেল ও গ্যাস সম্প্রসারণের বেশিরভাগ বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রে, আর কয়লা সম্প্রসারণের বেশিরভাগ চীনা কোম্পানির হাতে গেছে।
ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের কারণে বিদ্যমান শক্তি ব্যবস্থায় ব্যয় বৃদ্ধি ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, ‘জীবাশ্ম জ্বালানি এখন স্থিতিশীলতা নয়, অস্থিরতার উৎস।’
নিকো লুসিয়ানি বলেন, ‘ব্যাংকগুলো সক্রিয়ভাবে একটি ভঙ্গুর, অস্থির ও ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানি শক্তি ব্যবস্থাকে সমর্থন করছে।’
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা মার্চে জানিয়েছে, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক তেলের বাজারে সবচেয়ে বড় সরবরাহ ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে।’
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট সলিউশনস ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ইরান-যুদ্ধ শুরু হওয়ায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকেই প্রতিটি আমেরিকান পরিবার অতিরিক্ত ৪২৪ ডলার বা মোট ৫৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার জ্বালানি খরচ দিয়েছে।
সিইইডি’র নির্বাহী পরিচালক গেরির ভাষায়, ‘২০২০-এর দশকের জীবাশ্ম জ্বালানি সংকট দেখিয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা শক্তি নিরাপত্তা নয়, এটি কাঠামোগত দুর্বলতা। জীবাশ্ম জ্বালানিতে প্রতিটি ডলার বিনিয়োগ জলবায়ু-সংবেদনশীল মানুষের জন্য মৃত্যুদণ্ডের শামিল।’


