বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। বছর দুয়েক আগেও জাতীয়ভাবে তেমন একটা পরিচিতি ছিল না। গত বছর আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর হঠাৎ রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা হয়ে ওঠেছেন। এখন দেশজুড়ে তার পরিচিতি।
শফিকুর রহমান এ পর্যন্ত চারবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু একবারও সংসদে যাওয়ার সুযোগ পাননি। এমনকি বিএনপির সঙ্গে চার দলীয় জোট করে যাওয়া নির্বাচনেও জিততে পারেননি। আগামী নির্বাচনে আবারও লড়বেন তিনি। এবার কি তার ভাগ্যের শিকে ছিঁড়বে? অতীতের হিসাব-নিকাশ থেকে দেখা যাক সেই সম্ভাবনা।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর ঘোরতর বিপদে পড়ে জামায়াতে ইসলামী।
এই দলের দেশজুড়ে পরিচিত প্রায় সকল নেতার ফাঁসি কিংবা আমৃত্যু যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।
এরপর এক পর্যায়ে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের দায়িত্ব পান শফিকুর রহমান। একসময় তিনি ছিলেন এই দলের সিলেট জেলার আমির।
শফিকুর রহমানের জন্মভূমি মৌলভীবাজার হলেও বেড়া ওঠা লেখাপড়া কর্মজীবন সবই সিলেট শহরে। এ কারণে ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সিলেট-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হন তিনি।
ভোটের মাঠে খুব একটা খারাপ করেননি। যেখানে ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট নিয়ে নির্বাচিত হয় বিএনপি, সেখানে তিনি পেয়েছিলেন ১৫ শতাংশ ভোট। সেবার ৩০ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট নিয়ে দ্বিতীয় হয়েছিল আওয়ামী লীগ।
পরের বার ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনেও সিলেট-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন শফিকুর রহমান। এই নির্বাচনে তার ভোট কমে যায়, এক ধাপ নিচে নেমে যায় অবস্থান। সেবার তিনি ভোট পেয়েছিলেন ৯ দশমিক ৮ শতাংশ, অবস্থান ছিল চতুর্থ।
হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে বিএনপির সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানকে মাত্র ৭২০ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে জয় পেয়েছিলেন আওয়ামী লীগের হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। প্রায় ২২ শতাংশ ভোট নিয়ে তৃতীয় স্থানে ছিলেন জাতীয় পার্টির বাবরুল হোসেন বাবুল।
এরপর গঠন হয় বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোট। আর ২০০১ সালের নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হন তিনি। তবে সিলেট-১ নয়, তাকে যেতে হয় জন্মভূমি মৌলভীবাজার-২ আসনে। সেবার সারা দেশে ছিল জোট প্রার্থীদের জয়জয়কার। কিন্তু শফিকুর রহমান সেবারও জয়ের নাগাল পাননি।
সেখানে জয় ছিনিয়ে নেন বিএনপির মনোনয়ন না পাওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এম শাহীন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর। জোটের প্রার্থী হয়েও মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে ছিলেন তিনি।
সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের নির্বাচনেও ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। কিন্তু সেবার শফিকুর রহমান নির্বাচন করেননি।
এর পরের নির্বাচন ২০১৮ সালে। সেবার তাকে ঢাকা-১৫ আসনে মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। কুখ্যাত রাতের ভোটে সেবার প্রহসনে পরিণত হয়েছিল নির্বাচন।
মীরপুরের একটি অংশ কাফরুল নিয়ে ঢাকা-১৫ আসনটি অতীতে ঢাকা-১১ আসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে এটি ভেঙে ঢাকা-১৫ সহ একাধিক আসন হয়েছে।
বিগত ১৯৯৬ সালে এককভাবে নির্বাচন করে এই আসনে জামায়াতে ইসলামী পেয়েছিল মাত্র ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ ভোট।
তবে ২০১৮ সালের নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসাবে নিজেকে বেশ ভালোভাবে পরিচিত করেছেন তিনি।
এ ছাড়া ঢাকার যে কয়েকটি এলাকায় জামায়াত সমর্থকদের আধিক্য আছে, কাফরুল তেমনি একটি এলাকা।
আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াত। এখানে শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। তিনি কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক।
তবে তিনি ঢাকার অন্যান্য আসনে বিএনপির প্রার্থীদের চেয়ে তুলনামূলক দুর্বল। আগামী নির্বাচনে সেই সুবিধা পেতে পারেন ডা. শফিক।
ঐতিহাসিকভাবে ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর ভোট খুব কম। চারদলীয় জোট গঠনের আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ঢাকার একটি আসনে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন জামায়াতের তখনকার ভারপ্রাপ্ত আমির আব্বাস আলী খান।
পুরোপুরি এককভাবে অংশ নেওয়া ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে রাজধানীর ভেতরে কোনো আসনে এই দলের ভোট চার শতাংশ স্পর্শ করেনি।
অতীত ভোটের ইতিহাস শফিকুর রহমানের জন্য খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। তবে আগামী নির্বাচনে নিজের শক্ত পরিচিতি, অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষ আর বিএনপির বিরুদ্ধে ঢাকাজুড়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানকে এগিয়ে দিতে পারে।


