জামায়াতে ইসলামীর আমিরের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে নারীবিদ্বেষী পোস্ট দেওয়া নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। এই ঘটনায় অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাকড’ হওয়ার অভিযোগে বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হলেও তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ মেলেনি। তা সত্ত্বেও বুধবার রাতে জামায়াতে ইসলামীর করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় ডিবি পুলিশ।
এর আগে সন্ধ্যায় জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। বৃহস্পতিবার এই মামলায় আদালতে পাঠানো হলে ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদ তাকে জামিন দেন।
ডিবি কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, জামায়াতের দাবিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হ্যাকিংয়ে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না পাওয়ার পরও একজন সরকারি কর্মকর্তাকে আটক ও বঙ্গভবনে পুলিশের তল্লাশির ঘটনায় বিশ্লেষকরা আলোচিত ‘জজ মিয়া’ নাটকের পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দেখছেন।
প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই আরিফ রেজা জানান, হাতিরঝিল থানার সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় বুধবার রাতে ছরওয়ারে আলমকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই খন্দকার সালেহ আবু নাইম তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে রাখার আবেদন করলে আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. আলমগীর জামিন চান। বিপরীতে জামায়াতপন্থী আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক জামিনের বিরোধিতা করেন। আদালত শুনানি শেষে জামিন মঞ্জুর করেন।
ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, মোবাইল ফোন ও কম্পিউটারের ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার আগে ছরওয়ারে আলমের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই অবস্থায় তাকে গ্রেপ্তারের খবরে হাতিরঝিল থানা পুলিশ দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এমনকি ডিবি প্রধান যখন গ্রেপ্তারের তথ্য দেন, তখন তার সঙ্গে টিমের কেউ ছিলেন না। কোন তথ্যের ভিত্তিতে ছরওয়ারে আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেই প্রশ্নের জবাবও তিনি এড়িয়ে যান।
অন্যদিকে, বঙ্গভবনের কর্মকর্তারা জানান, জামায়াতের আইটি শাখার দাবি অনুযায়ী ছরওয়ারে আলমের ই-মেইল ব্যবহার করে হ্যাকিং করা হয়েছে। এই দাবির প্রেক্ষিতে তাকে বাসা থেকে তুলে ১২ ঘণ্টা পর গ্রেপ্তার দেখানো হলেও সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ ডিবি দিতে পারেনি।
পুরো ঘটনার একটি কারিগরি বিশ্লেষণ করেছে টাইমস অব বাংলাদেশ। সেখানে দেখা যায়, বঙ্গভবনের যে ই-মেইল থেকে ফিশিং মেইল আসার দাবি করা হচ্ছে, সেটি এসেছে ১০ জানুয়ারি। প্রশ্ন উঠেছে, ফিশিং ১০ জানুয়ারি হলে অ্যাকাউন্ট কেন ৩১ জানুয়ারিতে হ্যাক হবে?
এ ছাড়া জামায়াত আমিরের ই-মেইলে ৫ হাজার ৬৭৯টি না খোলা মেইল রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৫০টি মেইল আসলেও ২০ দিন আগের একটি মেইল হাজারো বার্তার নিচে চাপা পড়ে থাকার কথা। ৩১ তারিখে তিনি হঠাৎ কেন ইনবক্সের অনেক নিচে থাকা ওই পুরোনো মেইলে ক্লিক করবেন, তা স্পষ্ট নয়।
জামায়াতের তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মাহমুদুল আলম এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট নয়, বরং তার ডিভাইস হ্যাক হয়েছিল। বিকেল ৫টা ৯ মিনিটে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে সেশন বন্ধ করা হয়।
তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিভাইস হ্যাক হলে ফরেনসিক বিশ্লেষণ, ম্যালওয়্যার বা রিমোট অ্যাক্সেসের প্রমাণ থাকা জরুরি। ভিন্ন ডিভাইস বা লোকেশন থেকে লগইনের কোনো হিস্ট্রি বা নতুন লগইন অ্যালার্টের তথ্যও জামায়াত দেখাতে পারেনি। তারা শুধু ৫টা ৯ মিনিটে পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের ই-মেইল দেখিয়েছে, কিন্তু অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধারের জন্য কোনো ‘ফরগট পাসওয়ার্ড’ বা ভেরিফিকেশন কোডের মেইল থাকার তথ্য মেলেনি। এমনকি এক্স সাপোর্ট টিমের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো রেকর্ডও তারা প্রকাশ করেনি, যা স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
উল্লেখ্য, গত শনিবার জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একটি পোস্টে বলা হয়, নারীদের নেতৃত্বে আসা আল্লাহ অনুমোদন করেননি। আধুনিকতার নামে নারীদের ঘরের বাইরে ঠেলে দেওয়া পতিতাবৃত্তি ছাড়া কিছু নয়।
এই নারী বিদ্বেষী পোস্ট নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে জামায়াত দাবি করে এটি হ্যাকিংয়ের কাজ। এই অভিযোগেই গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে রাজারবাগের বাসা থেকে ছরওয়ারে আলমকে আটক করা হয়। তবে ডিবির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমসকে জানান, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে পোস্টের সঙ্গে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মূলত রাজনৈতিক চাপেই তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


