ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সহায়তায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্প থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি নিয়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি)।
জাপানের মিতসুবিশি করপোরেশন ও ফুজিতা করপোরেশন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে গঠিত হয়েছে এডিসি।
প্রকল্পে নিম্নমানের পণ্য, অসম্পূর্ণ কাজ, দ্বৈত বিল, অনুমোদনহীন ব্যয় এবং বাধ্যতামূলক পরীক্ষা এড়িয়ে এই বাড়তি অর্থ নেয় ঠিকাদার। টাইমস অব বাংলাদেশের অনুসন্ধানে এই প্রকল্পে মোট ৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকার দুর্নীতির যেই তথ্য উঠে এসেছে, তার মধ্যেই বাড়তি নেওয়া এই অর্থ রয়েছে।
অনুসন্ধান বলছে, বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনওসিডি জেভির সহায়তায় লুটপাটের এই পথ তৈরি করে দিয়েছিল জাইকা। মূলত ঋণদাতা, ঠিকাদার ও পরামর্শক একই দেশের হওয়ায় প্রকল্পটি থেকে অর্থ সরানো সহজ হয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনওসিডি জয়েন্ট ভেঞ্চারের সদস্য হচ্ছে জাপানি নিপ্পন কোয়েই ও ওসি গ্লোবাল, সিঙ্গাপুরের সিপিজি এবং বাংলাদেশের ডিডিসি লিমিটেড।
আরও পড়ুন: শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনালে ৮৪৪১ কোটি টাকার দুর্নীতি
অনুসন্ধানের প্রথম ধাপে টাইমস প্রায় ছয় হাজার ও দ্বিতীয় ধাপে আরও এক হাজার পৃষ্ঠার চুক্তিপত্র, বিল, আদেশ, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, চিঠি, ঋণ ও প্রকল্পসংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণ করেছে। একই সঙ্গে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) দুটি দাবিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা ৬ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অনিয়মের মাধ্যমে ৫ হাজার ৩৭ কোটি টাকা বাড়তি নিয়েছে। আর প্রকল্পের বিলম্বজনিত ক্ষতিপূরণ ও বিভিন্ন বিলবাবদ এডিসির কাছে বেবিচকের দাবি ১ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা।
নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রকল্পটির ঠিকাদার ও পরামর্শক নির্বাচনসহ প্রযুক্তিগত শর্ত নির্ধারণে জাইকা সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে। জাপানের এই সরকারি সংস্থাটি আন্তর্জাতিক পরামর্শকের সংক্ষিপ্ত তালিকা দিয়েছিল যেখান থেকে এনওসিডি জয়েন্ট ভেঞ্চারকে বেছে নেয় বাংলাদেশ। এ ছাড়া প্রকল্পের প্রযুক্তিগত শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল যাতে জাপানি ঠিকাদারই কাজ পায়।
এমনকি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এডিসি যখন বেশি বেশি বিল নিচ্ছিল, তখন এডিসির বাড়তি দাবি মেটাতে আরও ঋণ দিতে বাংলাদেশকে প্রস্তাব দিয়েছিল জাইকা। অর্থাৎ, একদিকে জাপান ঋণ দেবে, অন্যদিকে জাপানি প্রতিষ্ঠানই সেই টাকা নিয়ে যাবে, মাঝ দিয়ে দায় চাপবে বাংলাদেশের জনগণের ওপর–এমন কৌশল বাস্তবায়ন করা হয়েছে এখানে।
২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার প্রকল্পটিতে জাইকা তিন দফায় ১৬ হাজার ১২ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। আর ঠিকাদারের বিলের পরিমাণ ঋণের প্রায় সমান। মোট ব্যয়ের বাকি অর্থের প্রায় পুরোটা গেছে পরামর্শকের বিল এবং ভ্যাট, ট্যাক্স ও শুল্ক পরিশোধে।
এই প্রকল্পের অর্থদাতা, পরামর্শক ও ঠিকাদার একই দেশের হওয়ায় এই ব্যবস্থাকে সরাসরি ‘স্বার্থের সংঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
প্রকল্পটিতে ‘মেগা দুর্নীতি হয়েছে’ উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘এই দুর্নীতির দায় জাইকা এড়াতে পারে না। জাইকাসহ প্রকল্পে যুক্ত সব বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় এনে অর্থ উদ্ধার করতে হবে।’
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় বেবিচকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেন, ‘জাপানি ঋণের শর্তে নির্দিষ্ট প্রযুক্তি ও প্রতিষ্ঠান যুক্ত করা হয়েছিল, অথচ সেগুলো বাংলাদেশের প্রয়োজন ও পরিবেশের উপযোগী ছিল কি না–তা যাচাই বা কার্যকরভাবে দরকষাকষি করার সক্ষমতা বাংলাদেশ সরকারের ছিল না। শুরুতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসব প্রযুক্তির পক্ষে সাফাই গাইলেও পরে তারাই জানায়, এর কিছু অংশ বাংলাদেশে কার্যকর নয়।’
‘পরে এই টার্মিনালের অপারেশনের কাজটিও জাপানি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিল জাইকা,’ টাইমসকে বলেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
বেবিচকসহ প্রকল্পে জড়িত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিবর্গ সকলেই লুটপাটে সহযোগিতা করে। ফলে মোহাম্মদ মফিদুর রহমান নিজেও তার দায় এড়াতে পারেন না।
যেভাবে অর্থ লুট
নথি বলছে, পরিবর্তন আদেশ ও প্রাইস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে সব থেকে বেশি বাড়তি অর্থ নিয়েছে ঠিকাদার। বাধ্যতামূলক অনুমোদনগুলো পাস কাটিয়ে এডিসিকে ৩ হাজার ১২ কোটি টাকা দিয়েছে বেবিচক যাতে সহায়তা করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়।
পণ্যের ব্র্যান্ড ও উৎপাদনকারী দেশ বদলে দিয়ে ঠিকাদার ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা বেশি নিয়েছে। কমদামি ও নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করেও চু্ক্তিমূল্য অনুযায়ী বিল নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
মাটির কাজে ২২৯ কোটি টাকা অতিরিক্ত নিয়েছে ঠিকাদার। একই সড়কের জন্য দুই খাত থেকে দুবার বিল নেওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে বেবিচকের নথিতে।
যে কাজ সম্পন্ন হয়নি, তারও বিল নিয়েছে। বাধ্যতামূলক ট্রায়াল (ওআরএটি) না করেই এডিসি নিয়েছে ৪৩২ কোটি টাকা। এরপরও এই খাতে নতুন বরাদ্দ দিতে যাচ্ছে সরকার। এদিকে, পরীক্ষা ও সনদ ছাড়াই বড় অঙ্কের বিল নিয়েছে ঠিকাদার।
নথিতে স্টেইনলেস স্টিলের বদলে মাইল্ড স্টিল, ডাকটাইল আয়রন ও কমদামি বিকল্প ব্যবহারের তথ্য রয়েছে। নাট-বল্টু ও যন্ত্রাংশে মরিচা ও ক্ষয় পেয়েছে বেবিচক। বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে জরুরি রেডিও যোগাযোগব্যবস্থা চালু করতে পারেনি ঠিকাদার।
আপসে সরকার
এমন বেপরোয়া লুটপাটের পরও অর্থ উদ্ধারের বদলে ঠিকাদারের সঙ্গে আপসের পথে গেছে বাংলাদেশ।
চলতি বছরের ৬ মে আপস-মীমাংসা কমিটির দেওয়া রায় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেবিচকের দাবি করা অর্থের মধ্যে প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার দাবি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তামাদি হয়ে গিয়েছিল।
এর আগে দুটি রাষ্ট্রীয় নিরীক্ষায় প্রকল্পে ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অনিয়ম উদঘাটিত হওয়ার পড়ে ঠিকাদারের কাছে বাড়তি অর্থ ফেরত দাবি করে বেবিচক।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়ে দায়িত্বে থাকা বেবিচক চেয়ারম্যান মফিদুর রহমান সময়মতো দাবি উত্থাপন না করাকে একটি ‘অনিয়ম’হিসেবে স্বীকার করেছেন।
টাইমসকে তিনি বলেন, ‘কাজ দ্রুত শেষ হওয়ার স্বার্থে ঠিকাদারের সঙ্গে বিরোধে জড়ায়নি বেবিচক। কারণ, জাপানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে খুবই গুরুত্ব দেয় বাংলাদেশ সরকার।’
নথি বলছে, ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের ভৌত কাজ ৯৮ শতাংশ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তবে নানা অনিয়ম ও জটিলতায় এবং পরবর্তী কর্মকর্তাদের অদক্ষতায় গত দুই বছরের বেশি সময়েও বাকি ২ শতাংশ কাজ শেষ করে টার্মিনাল চালু করা সম্ভব হয়নি।
মন্তব্য জানতে বেবিচক চেয়ারম্যান মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকের সঙ্গে তিন দফায় যোগাযোগ হলেও ব্যবস্ততার কারণ দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করছেন।
এদিকে, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনওসিডি জেভি লিখিতভাবে টাইমসকে জানিয়েছে, গোপনীয়তার বাধ্যবাধকতার কারণে প্রকল্প-সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর তারা দিতে পারবে না।
প্রকল্পের অনিয়ম সম্পর্কিত প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে জাইকা ও এডিসি।


