গত ৮ মে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের কাঁচিবাড়ীর বাসিন্দা রত্নেশ্বর কুমার। কুকুরের কামড়ের পর সময়মতো জলাতঙ্ক নিরোধক ভ্যাকসিন না পাওয়াই তার মৃত্যুর কারণ। অথচ সঠিক সময়ে চিকিৎসা পেলে এই মৃত্যু শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল।
রত্নেশ্বরের ভাই রবীন্দ্র কুমার জানান, কামড় খাওয়ার পরপরই তারা সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। সেখানে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা হলেও জানানো হয় ভ্যাকসিন নেই। এরপর গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তারা। বেসরকারি ক্লিনিক ও ওষুধের দোকানে হন্যে হয়ে খুঁজেও কোথাও মিলছিল না জীবনরক্ষাকারী এই ওষুধ।
অবশেষে ২৪ ঘণ্টা পর চড়া দামে একটি ভ্যাকসিন জোগাড় করা সম্ভব হলেও ততক্ষণে রত্নেশ্বরের শরীরে জলাতঙ্কের লক্ষণ দেখা দেয়। চিকিৎসকদের মতে, এই রোগের লক্ষণ একবার প্রকাশ পেলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আর বাঁচানো সম্ভব হয় না।
দেশজুড়ে হাহাকার, সরকারের নীরবতা
ভ্যাকসিনের এই ভয়াবহ সংকট কেবল গাইবান্ধায় নয়, বরং সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি সরবরাহ প্রায় বন্ধ। স্থানীয়ভাবে ভ্যাকসিন কেনার জন্য হাসপাতালগুলোকে মাত্র ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা দিয়ে চাহিদার তুলনায় নগণ্য পরিমাণ ডোজ কেনা সম্ভব।
এই সংকট নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) হাসপাতাল শাখার পরিচালক আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান এবং ইপিআই শাখার সহকারী পরিচালক হাসনুল মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করেননি।
ভ্যাকসিন সংকটের এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক অভিহিত করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. লেলিন চৌধুরী। তিনি বলেন, জলাতঙ্ক ভ্যাকসিনের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। এই ভ্যাকসিনের অভাব মানেই একজন মানুষের জন্য মৃত্যু পরোয়ানা।
আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মৃত্যু
জলাতঙ্কের কোনো নিরাময় নেই, এর মৃত্যুহার শতভাগ। সাধারণত কুকুরের কামড় বা আঁচড় থেকে এটি ছড়ায়। ২০১০ সালের আগে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় আড়াই হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যেত। সরকারের ব্যাপক টিকাদান ও সচেতনতা কর্মসূচির ফলে এই সংখ্যা অনেক কমে আসে। সরকারের লক্ষ্য ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে জলাতঙ্ক নির্মূল করা।
তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে পরিস্থিতি আবারও খারাপ হচ্ছে। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৪২ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জন জলাতঙ্কে মারা গেছেন। ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসেই মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯-এ। সরবরাহ ঠিক না হলে জলাতঙ্ক নির্মূলের লক্ষ্য বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
সংকটের শুরু ও বর্তমান চিত্র
সারাদেশে এই সংকট মূলত শুরু হয় ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে। নারায়ণগঞ্জের ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার জহিরুল ইসলাম জানান, সেই মাসে ৪ হাজার ডোজ চাহিদার বিপরীতে তারা পেয়েছিলেন মাত্র ৪০০ ভায়াল। এরপর থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন মশিউর রহমান জানান, তারা কেন্দ্রীয় বরাদ্দের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। বর্তমানে জেলার চারটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো ভ্যাকসিন নেই। হাসপাতালের স্টোরকিপার নোমান ভূঁইয়া জানান, গত এপ্রিল মাসে ৬ হাজার ৭১১ জন রোগী এলেও বর্তমানে মজুত আছে মাত্র ২৩৯ ভায়াল, যা দিয়ে মাত্র ৯৫৬ জনকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।
সুন্দরগঞ্জে আতঙ্ক ও রোগীদের দুর্ভোগ
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে রত্নেশ্বরের মৃত্যুর দুদিন আগে নন্দ রাণী ও ফুলু মিয়া নামের আরও দুজন জলাতঙ্কে মারা যান। আরও অন্তত ১৩ জন কুকুরের কামড়ে আহত হয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা দিবাকর বসাক জানান, দীর্ঘদিনের সংকটের পর এ মাসে মাত্র ৩০টি ভ্যাকসিন কেনার বরাদ্দ পেয়েছেন তারা।
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালেও কোনো ভ্যাকসিন নেই। তাসপিয়া, ববিতা ও বিশাল তালুকদারের মতো রোগীরা জানান, সরকারি হাসপাতালে না পেয়ে তারা বাইরে থেকে চড়া দামে ভ্যাকসিন কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
অবশ্য হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম আশা করছেন, দু-তিন দিনের মধ্যে নতুন সরবরাহ আসবে।
নামমাত্র বরাদ্দ ও অপচয়
কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন অভিজিৎ শর্মা জানান, প্রতিটি হাসপাতালে ভ্যাকসিন কেনার জন্য সরকারিভাবে ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে ইটনা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিধান দেবনাথ বলেন, এই টাকায় মাত্র ৩৩ ভায়াল ভ্যাকসিন পাওয়া যায়। একজন রোগীকে পূর্ণ মেয়াদে পাঁচটি ডোজ দিতে হয়। সময়মতো রোগী না আসলে একটি ভায়াল খুলে বাকি অংশ ফেলে দিতে হয়, যা অপচয় বাড়াচ্ছে।
জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মাহফুজুর রহমান সোহান জানান, তাদের হাসপাতালে প্রায় এক বছর ধরে কোনো ভ্যাকসিন নেই। বকশীগঞ্জ ও ইসলামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যে সামান্য সরবরাহ আছে, তা জনসংখ্যার তুলনায় নগণ্য।
খুলনা ও রাজশাহীর পরিস্থিতি
খুলনা জেনারেল হাসপাতালেও কয়েক দিন ধরে ভ্যাকসিন নেই। ডেপুটি সিভিল সার্জন মিজানুর রহমান জানান, সংকট মোকাবিলায় কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের খুলনা ডিপো ইনচার্জ কাজী নূর ইমাম আল মামুন জানান, তারা বেসরকারি ফার্মেসিগুলোতে নিয়মিত সরবরাহ দিচ্ছেন।
রাজশাহী বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক হাবিবুর রহমান অবশ্য কোনো সংকটের কথা স্বীকার করেননি। তবে ডেপুটি সিভিল সার্জন মাহবুবা খাতুন জানান, উপজেলা পর্যায়ে ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট রয়েছে। বর্তমানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ভ্যাকসিন সরবরাহের কার্যক্রম সমন্বয় করা হচ্ছে।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন খুলনা থেকে আলী আবরার, রাজশাহী থেকে আব্দুল আউয়াল, নারায়ণগঞ্জ থেকে বিল্লাহ হোসেন, জামালপুর থেকে সায়মুম সাব্বির শোভন এবং কিশোরগঞ্জ থেকে রকিবুল হাসান রুকেল।)


