দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন স্ক্রল করা, মেসেজ লেখা কিংবা হাতের মুঠোয় ফোন রেখে একটানা ভিডিও দেখার কারণে কবজি ও আঙুলের গাঁটে মারাত্মক ব্যথা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারে আঙুলের পেশির সঙ্গে যুক্ত রগ ও শিরায় চাপ পড়ে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে ফোন ব্যবহার পরে আরও গুরুতর সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
বৃদ্ধাঙ্গুলের মাধ্যমে ফোনে মেসেজ লেখা, স্ক্রল করার কারণে হওয়া নানা ধরনের ব্যথাকে সাধারণভাবে ‘টেক্সটিং থাম্ব’ (বার্তা বৃদ্ধাঙ্গুলি) বলা হয়। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে আঙুল শক্ত হয়ে যাওয়া, গাঁটের কাছে চিনচিনে ব্যথা এবং বৃদ্ধাঙ্গুল ভাঁজ করার সময় ‘ক্লিকের মতো’ শব্দ বা অনুভূতি হওয়া।
এ ধরনের সমস্যা চিকিৎসা ছাড়া দীর্ঘদিন চলতে থাকলে বারবার টাইপ করা ও পর্দায় আঙুল চালানোর কারণে কবজির স্নায়ুতে অতিরিক্ত চাপ পড়া, বাত এবং অন্য জটিলতা তৈরি হতে পারে।
জীবন সহজ করতে নিত্যনতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন কিছুক্ষেত্রে মানব সভ্যতার জন্য আশীর্বাদ হয়ে এলেও যান্ত্রিক জীবনে কয়েকগুনে বেড়েছে শারীরিক প্রতিকূলতা বা স্বাস্থ্যঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক দশক ধরেই মানুষ নানা যন্ত্রে দ্রুত আঙুল চালিয়ে আসছে। কীবোর্ড, ফোনের স্ক্রিন, বিভিন্ন আধুনিক গেমের রিমোটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করছে মানুষ। অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে দৈহিক জটিলতাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। একসময় এ ধরনের সমস্যাকে ‘ব্ল্যাকবেরি থাম্ব’ বলা হতো।
বর্তমানের স্মার্টফোনগুলো আগের তুলনায় আকারে বড় ও ভারী হয়েছে। একই সঙ্গে ফোন ব্যবহারের ধরনও বদলেছে। এখন মানুষ কথা বলা ও বার্তা পাঠানোর পাশাপাশি ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেতিবাচক খবর দেখতে থাকে, চিকিৎসা কিংবা খাবারের বিল পরিশোধ করে এবং পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিক নাটক বা সিরিজে বুদ হয়ে থাকে।
কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের হ্যান্ড সেন্টারের চিকিৎসক মরিন ও’শনেসি বলেন, মোবাইল যন্ত্র এখন জীবনের স্থায়ী অংশ। তাই কাউকে ফোন ব্যবহার করতে নিষেধ করার বদলে আধুনিক জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কীভাবে এসব যন্ত্র ব্যবহার করা যায় তা শেখা ও ভাবা প্রয়োজন।
বৃদ্ধাঙ্গুলের ব্যথা এড়াতে একই ভঙ্গিতে দীর্ঘ সময় না থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কবজি ও কনুই একই অবস্থায় রাখলে বৃদ্ধাঙ্গুলের গোড়া বা কবজিতে ব্যথা হতে পারে। দীর্ঘ সময় ফোন অনেকটা খাড়া করে ধরে রাখলেও অন্য আঙুলগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
ও’শনেসি বলেন, ‘মানুষ সাধারণত তখনই ফোন ব্যবহারের কারণে হওয়া ব্যথার বিষয়টি বুঝতে পারে, যখন তারা কিছুদিন তুলনামূলক কম ফোন ব্যবহার করে। যেমন ডিভাইস ছাড়া কোনো ছুটিতে গেলে ফোন ব্যবহারের কারণে হওয়া অস্বস্তি বা মৃদু ব্যথা অনেক সময় কমে যায়।’
এ ব্যথা কমানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ফোন ব্যবহারের সময় সীমিত করা বা একটানা পর্দায় আঙুল চালানোর মাঝে ছোট বিরতি নেওয়া। তবে বাস্তবে এটি অনেকের জন্য কঠিন।
ফোন থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা সম্ভব না হলে ভঙ্গি বদলানো, এক হাতের বদলে অন্য হাত দিয়ে লেখা এবং বৃদ্ধাঙ্গুলের পরিবর্তে তর্জনী বা অন্য আঙুল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ফোনে থাকা সহায়ক সুবিধাগুলোও বৃদ্ধাঙ্গুলের অতিরিক্ত ব্যবহার কমাতে পারে। আধুনিক স্মার্টফোনগুলোতে কণ্ঠস্বরকে লেখায় রূপান্তর করার সুবিধা রয়েছে। এটির পর্যাপ্ত ব্যবহার হাত ও আঙুল ওপর চাপ কমাতে পারে। আবার স্ক্রিনে ভেসে থাকা লেখার আকার বড় করে নিলে ফোন চোখের খুব কাছে ধরে রাখার প্রয়োজনও কমে। এতে হাতের পাশাপাশি চোখেরও ক্ষতি কম হয়।
ইদানিং সহজে ফোন ধরে রাখতে ফোনের কাভারের পেছনে লাগানো গোল বা আংটির আকৃতির মতো সহায়ক উপকরণও ব্যবহার করা হয়। এগুলো ফোনের ওজন হাতের ওপর তুলনামূলক সমানভাবে ছড়িয়ে দেয়। ভিডিও বা অনুষ্ঠান দেখার সময় ফোন এক জায়গায় স্থির রাখতেও এসব উপকরণ কাজে আসে।
দীর্ঘ সময় ফোন কিংবা কীবোর্ড ব্যবহারের পর হাতে চিনচিন ব্যথা হলে প্রতিদিন বৃদ্ধাঙ্গুল ও কবজির হালকা ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কবজি নমনীয় রাখতে হাতের তালু নিজের দিকে রেখে বিপরীত দিকে কাত করতে হবে। অন্য হাত দিয়ে কবজিকে হালকাভাবে টেনে ও নিচের দিকে চাপ দিয়ে এ ব্যায়াম করা যেতে পারে।
ও’শনেসি প্রতিটি আঙুল আলাদাভাবে ভাঁজ করা এবং হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল ও তর্জনীর সাহায্যে বৃত্ত তৈরিরও পরামর্শ দিয়েছেন।
বৃদ্ধাঙ্গুলের গোড়ায় ব্যথা হলে হাত একটি সমতল স্থানে রেখে বৃদ্ধাঙ্গুলকে অন্য আঙুলগুলো থেকে দূরে টানতে হবে। এ অবস্থায় প্রায় ৩০ সেকেন্ড ধরে রাখতে বলা হয়েছে।
ফোন ব্যবহারের সময় কমানো, বরফ দেওয়া বা আইবুপ্রোফেনের মতো ব্যথানাশক ব্যবহারের পরও যদি ব্যথা, অসাড়তা বা ঝিনঝিন ভাব থেকে যায় তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কারণ এর পেছনে আরও গুরুতর কোনো সমস্যা থাকতে পারে।
একটানা ফোন ব্যবহার বৃদ্ধাঙ্গুলের বাতের সমস্যা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে এটি ডি কোয়ারভেইনের টেনোসাইনোভাইটিস নামের সমস্যার কারণ হতে পারে (বৃদ্ধাঙ্গুলের গোড়া ও কবজিতে তীব্র ব্যথা বা ফোলা)।
অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার কবজির স্নায়ু চাপে পড়ে সৃষ্ট কার্পাল টানেল সমস্যাও তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া ‘ট্রিগার থাম্ব’ নামে পরিচিত সমস্যায় বৃদ্ধাঙ্গুল ভাঁজ করার সময় সেটি আটকে যাওয়ার মতো ব্যথাযুক্ত অনুভূতি হয়। রগে প্রদাহের কারণে এ সমস্যা তৈরি হয়।
একটানা পর্দায় আঙুল চালানো ও বারবার সোয়াইপ (এক পাশ থেকে অন্য পাশে নাড়াচাড়া) করার অভ্যাসে আটকে যাওয়া খুবই সহজ। তবে সচেতনভাবে অল্প সময়ের বিরতি নিয়ে শরীরের ভঙ্গি বদলালেও উপকার পাওয়া যেতে পারে।
সিডার্স-সিনাই অর্থোপেডিকস অ্যান্ড স্পোর্টস মেডিসিনের শল্যচিকিৎসক ইউজিন সাই বলেন, মানুষের হাত সারাদিন ফোন ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়নি। তাই ফোন ব্যবহার করতে হলে হাতের প্রতিও যত্নশীল হতে হবে।
সূত্র: এপি


