জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আয়নায় আগের সেই মুখ আর দেখেন না খোকন চন্দ্র বর্মণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার সামনে গুলিতে তার মুখমণ্ডল প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে যায়। ওপরের ঠোঁট, মাড়ি, নাক, তালু ও বা চোখের অস্তিত্ব নেই। সেই জায়গায় এখন বড় একটি গর্ত।
পেশায় গাড়িচালক ছিলেন ২৩ বছর বয়সী খোকন। আন্দোলনের শুরু থেকেই যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছিলেন। ৫ আগস্টও মিছিলে যোগ দেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আহত অবস্থায় একজনকে নিজের মুঠোফোনের লক খুলে দেন, যাতে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। পরে সেই ব্যক্তিই ফোন করে বড় ভাই খোকা চন্দ্র বর্মণকে খবর দেন।
এখন তার ঠিকানা মহাখালীর সাততলা স্টাফ মহল্লার ছোট্ট একটি টিনশেডের ঘর। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও মুখে মাস্ক, চোখে কালো চশমা। চশমা খুলতেই বোঝা গেল, নিজেকে এভাবে আড়াল করে রাখেন। একটি চোখ আর নেই, অন্য চোখের দৃষ্টিও প্রায় হারিয়ে গেছে। কথা বলতে বলতে চোখের কোণ বেয়ে বারবার তরল গড়িয়ে পড়ছিল।
অভ্যুত্থানের দুই বছর পর টাইমস অব বাংলাদেশের মুখোমুখি হয়ে তিনি তুলে ধরেছেন তার আক্ষেপ, স্বপ্ন আর প্রত্যাশার কথা।
জুলাই আন্দোলনের পর প্রায় দুই বছর পার হয়ে গেছে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছরের মতো দায়িত্বে ছিল, আর বর্তমান নির্বাচিত সরকারও অর্ধবছর পার করছে। একজন আহত আন্দোলনকর্মী হিসেবে এই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে কীভাবে দেখছেন?
আমরা রাজনীতিতে জড়িয়েছি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কাজ করার লক্ষ্য নিয়ে। কিন্তু দেশের রাজনীতির যে অবস্থা, সেটাকে এখনো ভালো বলতে পারছি না। সহিংসতা এখনো আছে।
কিছুদিন আগে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী হবিগঞ্জে শহীদ পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তার কোনো বক্তব্যে ভুল থাকলে সেটার বিচার করার জন্য আইন আছে, প্রশাসন আছে। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে যেভাবে হামলা করা হলো, একজনের চোখ নষ্ট করে দেওয়া হলো–এটা খুবই কষ্টের।
জুলাইয়ে হাসিনা সরকার যেভাবে আমাদের ভাইদের হত্যা করেছিল, চোখ নষ্ট করেছিল, জুলাই-পরবর্তী সময়েও সেই একই ধরনের দৃশ্য দেখতে হবে–এটা কখনো আশা করিনি।
শুরুতে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, দুই বছর পর সেই প্রত্যাশাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
আমাদের প্রত্যাশা ছিল, নতুন সরকার দেশের উন্নয়ন করবে, শৃঙ্খলার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, জনগণের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবে এবং কৃষির দিকে নজর দেবে। সেই প্রত্যাশা এখনো আছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দেশের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছে, এটা মানতে হবে। তবে তাদেরও কিছু ভুল ছিল। আমার মনে হয়, সরকারের চেয়ে তাদের কিছু কর্মীর কারণেই বেশি সমস্যা তৈরি হয়েছে।
আপনার চিকিৎসার বর্তমান অবস্থা কী?
চিকিৎসার জন্য এখন পর্যন্ত তিনবার বিদেশে গিয়েছি। আবার ২৪ আগস্ট যাওয়ার কথা আছে।
সরকার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে এবং মাসিক একটি ভাতাও দিচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ হয়েছে, তবে নির্দিষ্ট পরিমাণ বলতে পারব না। তবে আগের তুলনায় এখন অনেকটা ভালো আছি। আগে তো ঠিকমতো কথাই বলতে পারতাম না। মুখের এই অংশটা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত ছিল।
আপনার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশা কতটা?
চিকিৎসকেরা বলেছেন, সময় লাগবে। ১০০ শতাংশের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সুস্থ হওয়া সম্ভব। তবে চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসবে কি না, সেটা এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।
আগে তো গাড়ি চালাতেন। এখন জীবিকা কীভাবে চলছে?
এখন পুরোপুরি সরকারি ভাতার ওপর নির্ভর করেই চলতে হচ্ছে। তবে যে ২০ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হয়, তা দিয়ে সংসার ঠিকমতো চলে না। আমার একটা পরিবার আছে, একটা ভবিষ্যৎ আছে। আমি একটা চোখে দেখি না, আরেকটা চোখেও খুব কম দেখি।
কেবল আমি না, আমার মতো আরও অনেক আহত ভাই আছেন, যারা এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না।
এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কারো সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে?
না, এখনো হয়নি। আমি অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে খুবই আগ্রহী। জানি না, তিনি আমার বিষয়টা মনে রেখেছেন কি না। আমি চাই, আমাদের মতো আহতদের জন্যও চাকরির ব্যবস্থা হোক, কিংবা এমন কোনো ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়া হোক, যাতে আমরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবার নিয়ে চলতে পারি।
যদি সরকারপ্রধানের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান, তাহলে তার কাছে আপনার প্রধান আবেদন কী থাকবে?
আমি বলব, জুলাইয়ে যারা আহত হয়েছেন এবং যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের পরিবারের খোঁজখবর যেন নিয়মিত নেওয়া হয়। শহীদ পরিবারের কাউকে চাকরি বা ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মতো আহত ভাইদের জন্যও যেন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়, যাতে তারা পরিবার নিয়ে চলতে পারেন। আর যাদের কারণে আমরা আজ এই প্রতিবন্ধী অবস্থায়, তাদের যেন উপযুক্ত বিচার ও শাস্তি হয়।
পরিবারে এখন কে কে আছেন?
বাবা, মা আর আমরা তিন ভাই–মোট পাঁচজন। বড় ভাই এখনো বিয়ে করেননি। আরেক ভাই ছোট। পরিবারের সবাই মূলত আমার চিকিৎসার বিষয়েই ব্যস্ত থাকে।
আপনি তো এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মী ও সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে কতটা সহযোগিতা পেয়েছেন?
চিকিৎসার ক্ষেত্রে সহযোগিতা পেয়েছি। বন্ধুরাও পাশে ছিল, এখনো যোগাযোগ রাখে। আমার তেমন কিছু চাওয়ার নেই, শুধু চাই চিকিৎসাটা যেন ঠিকমতো শেষ হয়।
এখন কি দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেন?
না। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যেভাবে হামলার ঘটনা ঘটে, তাতে কখন কী হয়ে যায় বলা যায় না। সেই আশঙ্কা থেকেই এখন আর কোথাও যাই না।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা নিয়ে আলোচনা চলছে। একজন আহত আন্দোলনকর্মী হিসেবে বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?
এখন এমন অবস্থা যে ছাত্ররাও ঠিকমতো কথা বলতে পারে না। কেউ কিছু বললেই বলা হয় সে বিএনপির লোক বা জামায়াতের লোক। বর্তমান সরকারের সময়েও যদি একই অবস্থা থাকে, মানুষ যদি স্বাধীনভাবে কথা বলতে না পারে, তাহলে তো পরিবর্তনের অর্থ থাকে না। যার যা বলার অধিকার আছে, সে সেটা বলতে পারবে।
তবে আওয়ামী লীগ যেভাবে মানুষ হত্যা করেছে, ক্ষমতায় থাকার জন্য নিজের দেশের মানুষের ওপর গুলি চালিয়েছে, তার পর তাদের এ দেশে রাজনীতি করার কোনো নৈতিক অধিকার আছে বলে আমরা মনে করি না।
জুলাইয়ে আহত ও শহীদদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ আছে?
হ্যাঁ, যোগাযোগ আছে। আমাদের জুলাইয়ের একটা সংগঠনও আছে। তবে দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে এখনো তেমন কোনো কর্মসূচি নেওয়া হয়নি।
ভবিষ্যতে যদি সক্রিয় রাজনীতিতে আসার সুযোগ পান, মানুষের কাছে আপনার প্রতিশ্রুতি কী হবে?
যদি কখনও সুযোগ পাই, শেরপুর জেলার মানুষের জন্য এমন কিছু করতে চাই, যাতে আমার মৃত্যুর পরও মানুষ আমাকে মনে রাখে। মানুষের উপকারে আসে–এমন কাজ করতে চাই।
সবশেষে, দেশের মানুষ ও আপনার সহযোদ্ধাদের উদ্দেশে কিছু বলতে চান?
মার আহত ভাইদের বলব, কেউ যেন থেমে না যান। যাদের সঙ্গে হয়তো নিয়মিত যোগাযোগ নেই, তারাও যেন চিকিৎসা চালিয়ে যান। আমি চাই, সবাই যথাযথ চিকিৎসা পাক এবং যেভাবে লড়াই করে টিকে আছেন, সেভাবেই এগিয়ে যান।


